নতুন শ্রম বিল, কয়েকটি কথা, কী বলা হয়েছে এই বিলে?

লপিতা সরকার
(অর্থনীতির অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক)

গত একুশে সেপ্টেম্বর ২০২০ রাজ্যসভায় ভোটাভুটি এড়িয়ে তিনটি শ্রম বিল (labour code) পাশ হল। আগের চব্বিশটি শ্রম আইন মিলে গিয়ে এই তিনটি নিয়ম তৈরি হল। এ প্রসঙ্গে বলি যে রাজ্যসভায় NDA র পক্ষে এখন যথেষ্ট সংখ্যা নেই। প্রথাগত ভোট হলে জেতার সম্ভাবনা ছিল না। তাই ‘অভূতপূর্ব’ উপায়ে ধ্বনিভোটে পাশ করা হল এই বিল। ( যেন পাড়ার দুর্গাপুজোর কমিটিতে ভোটাভুটি হচ্ছে )। এবার এই বিল রাষ্ট্রপতি সই করলেই তা পুরোপুরি আইনে পরিণত হবে। কী আছে এই বিলে ?

এতে প্রধাণতঃ তিনটি আলাদা শ্রম নীতির কথা বলা হয়েছে।

প্রথমটি The Occupational Safety, Health and Working Conditions code 2020

অর্থাৎ শ্রমিকদের পেশাগত সুরক্ষা ও কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত এই নিয়মাবলি ( code)। দিনে সর্বোচ্চ আট ঘন্টা কাজ করানো যাবে এবং মালিককে শ্রমিকদের পেশাগত সব ধরণের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। বিপজ্জনক কাজের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুরক্ষাবিধি থাকতে হবে। কিন্তু রাজ্যসরকার চাইলে নতুন ফ্যাক্টরির ক্ষেত্রে এইসব সুরক্ষার ধারাগুলো রদ করে দিতে পারে।

দ্বিতীয়টি হল The Code on Social Security 2020

যেখানে সংগঠিত ও অসংগঠিত সব ক্ষেত্রের শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার ছাতার তলায় আনা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে ।এই সুরক্ষাগুলি কী কী হতে পারে? নানারকম সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প আনা, প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা করা, শ্রমজনিত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ, বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, শিশুদের পড়াশুনার ব্যবস্থা এবং অবসৃত শ্রমিকদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করা। এমনকি বছরখানেক কাজ করলেই মিলতে পারে গ্রাচুইটির টাকা। এর জন্য সরকার বেসরকারি উদ্যোগগুলির সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য রাখা অর্থ ( Social Responsibility Fund ) ব্যবহার করতে পারে।

এই অবধি পড়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়বেন না। এগুলোর কোনটাই এখন হচ্ছে না। বলা হয়েছে যে ভবিষ্যতে একটি ‘Board ‘ গঠন করা হবে। তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে সুপারিশ করে পাঠাবে। তার মধ্যে থেকে ‘বেছে ‘ নিয়ে সরকার পদক্ষেপ নেবে ।

তৃতীয় কোডটি হল The Industrial Relations Code 2020

যেখানে বলা হয়েছে তিনশ জনের কম শ্রমিক যেসব কারখানায়/দোকানে কাজ করেন সেখানে বিনা নোটিশে ও বিনা ক্ষতিপূরণে যে কোন সময় শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে। এরজন্য সরকারের অনুমতি লাগবে না। এমনকি তিনশ জনের বেশি শ্রমিক যাদের তারাও ছাঁটাই করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারি শিলমোহর লাগবে l আগে কিন্তু ষাট থেকে নব্বই দিন পর্যন্ত নোটিশ পিরিয়ড ছিল। এই সুরক্ষা কবচটি এবার তুলে নেওয়া হল ।একটা কথা মনে রাখবেন যে ভারতের নব্বই শতাংশ শ্রমিকই কিন্তু অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন।
শ্রমিকরা ধর্মঘট করতে চাইলে ষাট দিন আগে নোটিশ দিতে হবে। হঠাৎ করে কর্মবিরতি করা যাবে না অর্থাৎ ধর্মঘট করার ক্ষেত্রে নোটিশ লাগবে আর ছাঁটাই করার ক্ষেত্রে লাগবে না। আমার নিজের মনে হয় যে দু ক্ষেত্রেই নোটিশ দেবার ব্যবস্থা থাকা ভালো ।

এবার আসা যাক শ্রমিকদের আশঙ্কার বিষয়গুলিতে।

প্রথমেই বলি ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ যা নাকি RSS এর শাখা সংগঠন তারা এই বিলটিকে শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ।

যদিও শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে কিছু ভালো ভালো কথা বলা হয়েছে কিন্তু তা চালু করার প্রক্রিয়া এখনই শুরু হচ্ছে না ।

মোদীসরকারের অচ্ছে দিন, না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা ইত্যাদি অসংখ্য আশ্বাসের অসার আচ্ছাদনে এই প্রতিশ্রুতি ঢাকা পড়ে যাবার সম্ভাবনা বাদ দেওয়া যায় না ।

এবার আসি তৃতীয় বিলটির কথায় যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। তিনশ জন পর্যন্ত কর্মচারী যেখানে কাজ করে সেখানে বিনা নোটিশে ছাঁটাই চলবে। এতে মালিক পক্ষ যে উল্লসিত হবে বলাই বাহুল্য।

কী হতে পারে এর ফলে ?

ছাঁটাই এর ভয় দেখিয়ে শ্রমিককে তার প্রাপ্য সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে। একটা উদাহরণ দিই। শ্রম নীতিতে দিনে আট ঘন্টা কাজ করার কথা বলা হয়েছে। এবার মালিক ছাঁটাই এর ভয় দেখিয়ে দিনে দশ ঘন্টা কাজ করিয়ে নিতেই পারে। যে দেশে এই সীমাহীন বেকারত্ব সে দেশে শ্রমিকের পক্ষে নিজের কাজটা বাঁচিয়ে রাখাই প্রধান দায় হয়ে দাঁড়াবে। যেসব সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে সেগুলো বাস্তবে কথার কথা হয়েই থাকবে ।

আমার তো মনে হয় প্রয়োজনে শ্রমিক অসুস্থতাজনিত ছুটিটুকুও পাবে না। অন্য সব সুরক্ষা তো দূর অস্ত!

শ্রমিক এখন যে কোন শর্তে তার কাজ বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করবে। নিম্নতম মজুরি কিম্বা গ্রাচুইটির টাকা কোনটাকেই সে অধিকার বলে ভাববে না ।মনে রাখবেন কৃষি বিলের ফলে কর্পোরেটের হাতে চাল, ডাল, গম, তেল, সব কিছু মজুত ও রপ্তানি করার অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

কর্পোরেটের সঙ্গে দরাদরির যুদ্ধে সরকার হেরে গেলে রেশন ব্যবস্থা লাটে উঠবে।

( রাজ্য সরকারগুলোকে কিন্তু তাদের GST র প্রাপ্য টাকা দেওয়া হচ্ছে না )। তাই ফ্রি তে রেশন না পাওয়া গেলে চাকুরি চলে যাবার মানে হল না খেতে পেয়ে সপরিবার পথে বসা ।

ছাঁটাই এর আর একটা বৃহত্তর দিক আছে। আর সেটা পুরো অর্থনীতিকে একদিক থেকে প্রভাবিত করে। সত্যি কথা বলতে কি তা মালিককেও ছাড়ে না। যখন কারোর কাজ চলে যায় তার আয়ও থাকে না। ফলে সে ব্যয় করবে কোথা থেকে? সে তখন বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু দরকার সেটুকুই কেনে ধার করে কিম্বা সঞ্চয় ভেঙে। আগে সে যে জিনিস কিনত এখন তা কেনে না। ফলে বাজারে সেইসব জিনিসের চাহিদা কমে। সেইসব জিনিস তৈরি করত যে কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন কম করতে হয়। ফলে সেইসব কারখানাতে এবার শ্রমিক ছাঁটাই হয়। ফলে বাজারে আরো চাহিদা কমে। এইরকম চলতেই থাকে। ( যাকে অর্থনীতিতে আমরা বলি depression বা recession )। একটু দেরিতে হলেও মালিক পক্ষও এর আঁচ টের পায় ,তাদেরও মুনাফা কমে।

বর্তমানে দেশ এইরকম একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছে। গাড়ি কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন কমাচ্ছে। শিল্পজাত দ্রব্যের চাহিদা ক্রমাগত কমছে বলেই হয়তো কৃষিপণ্যের, যার চাহিদা দুঃসময়েও থাকবে, ব্যবসা করার ছাড়পত্র কর্পোরেটের হাতে তুলে দিল এই মোদী সরকার।

এখন ভারতে GDP বা মোট উৎপাদন বৃদ্ধির হার -২৩.৯% অর্থাৎ ২৩.৯% হারে মোট উৎপাদন কমছে। তার মানে নিয়োগ,আয় ,চাহিদা সব কমছে।এর থেকে বেরোবার একমাত্র উপায় হল আয় বাড়ানো। আবার আয় বাড়াতে গেলে নিয়োগ বাড়াতে হবে। তবেই সাধারণ মানুষের হাতে টাকার যোগান আসবে আর তারা সে টাকা খরচ করবে। সেই খরচই মুনাফার যোগান দেবে। অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু এগুলো না করে কেন্দ্রীয় সরকার শিল্পপতিদের সুযোগ সুবিধে আরো বাড়িয়ে চলেছে। Corporate income tax কমিয়ে দেওয়া তার একটা উদাহরণ। তাতে সাময়িক ভাবে শেয়ার বাজার তাজা হলেও সামগ্রিক অর্থনীতির হাল ফেরে না। আর দীর্ঘকালীন সময়ে জনগণের ট্যাক্সের টাকা ঘুরপথে কর্পোরেটের হাতে দিয়ে অর্থনীতি বাঁচানোও যায় না। চিরদিন কি সবাইকে বোকা বানিয়ে রাখা যায় ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *