মানভুমের করম পরব আসলে কী?

নন্দন পাল

আজ শনিবার ঝাড়খন্ড পুরুলিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে পালিত হচ্ছে করম পরব। এই উৎসব আসলে শস্য বীজ, কৃষিকাজ ও প্রকৃতির বন্দনা। ভাদ্র মাসের পারসই একাদশীতে মানভূমের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে পালিত হয় এই উৎসব। ছোট ছোট আদিবাসী গ্রামগুলি আজ মেতে উঠেছে এই বর্ণময় উৎসবের উদযাপনে। মাহালি,মুন্ডা, ওঁরাও, কুড়মি সহ আরও অনেক সম্প্রদায়ের আদিবাসী প্রান্তিক মানুষজন আজ গ্রামের মাঝি বাবার বাড়িতে একত্রিত হয়ে ধান,গম, ভুট্টা, সরষে প্রভৃতির বীজের বন্দনায় একাত্ম হয়েছেন।

করম উৎসবের সূচনাটা হয় পারসই একাদশীর সাত দিন আগে থেকে। ছোট ছোট কুমারী মেয়েরা দলবেঁধে নদীতে স্নান করতে যায়। স্নান করে ফেরার সময় নতুন ঝুড়িতে ভরে নিয়ে আসে নদীর বালি আর মাটি। তারপর পরম ভক্তি ও আন্তরিকতার সাথে সেই মাটি-বালি ভর্তি ঝুড়ি নিয়ে আসা হয় গ্রামের মাঝি বাবার বাড়ির উঠোনে। সেই বালিতে রোপন করা হয় ভুট্টা,সরষে, ছোলা, গম, ধান প্রভৃতি শস্যের বীজ। তারপর সাতদিন ধরে চলে সেই বীজের লালন-পালন ও যত্নআত্তি। মেয়েরা প্রত্যেকদিন শুদ্ধ কাপড়ে, আচার মেনে সেই শস্যের উপর ঢালে হলুদ গোলা জল । আর প্রতি সন্ধ্যায় ওই শস্য ভরা ঝুড়ি গুলোকে ঘিরে শুরু হয় নাচ।

সাত দিনে রোপন করা শস্য বেড়ে ওঠে সবুজ চারা হয়ে। একে বলে ‘জাওয়া’। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজনের বিশ্বাস যে যত নিষ্ঠাভরে এবং যত্নআত্তি করে আচার পালন করে তার ‘জাওয়া’ তত ভালো হয়। এরপর করম পরবের আগের দিন, অর্থাৎ পারসই একাদশীর ঠিক আগের রাত্রে কিশোরী মেয়েরা ভাত খেয়ে ঝিঙে পাতায় একটুখানি ভাত আর একটা দাঁতন দিয়ে সেটাকে ঘরের চালে তুলে রেখে শুরু করে উপবাস। এই উপবাসের মধ্যেও পরদিন সকালে তারা গ্রামের বন-জঙ্গল তোলপাড় করে খুঁজে চলে পূজার সামগ্রী। ছেলেরাও কম ব্যস্ত থাকে না করম পরবএ । তারাও তাদের দিদি বা বোনের জন্য মাটির ঘোড়া বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ভাই ও বোনের সম্পর্কের বন্ধন এই উৎসবের আর এক দিক। এই ঘোড়া করম থানে রেখে পুজোর শুরু করতে হয়। আসলে বড় পাতাওয়ালা একটি গাছই হল করম পরবের দেবতা।

দেব জ্ঞানে সেই গাছকে পুজো করে আদিবাসী প্রান্তিক মানুষজন। সত্যিই তো গাছই তো দেবতা। গাছই তো রক্ষাকর্তা প্রকৃতির। যে দেবতার আশ্রয়ে থাকতে পারে মানুষ পশু পাখি সবাই। আর সেই করম দেবতা কোনো দামি উপকরণ বা ভোগ বিলাসিতার পণ্য চান না। গরীব আদিবাসী মানুষের হাতে গড়া পিঠে, বনফু্‌ল, ফল, পাতা পেলেই সন্তুষ্ট তিনি। তবে আদর আন্তরিকতা ভক্তি ও ভালবাসায় যেন কোন খামতি না থাকে। তাহলেই প্রসন্ন করম ঠাকুর। উন্নত নাগরিক পৃথিবী বুঝল না এই সত্য যা আমাদের দেশীয় প্রান্তিক আদিবাসী মানুষজন গুরুত্ব সহকারে অভ্যাস করে এসেছে, যুগে যুগে।

এদিকে করম পরবে রাজ্য সরকারের ‘সেকশনাল হলিডে’ ঘোষণার বিরোধীতা করে সাধারণ ছুটির দাবীতে এবছর আখড়া ছেড়ে রাস্তাতেই পালিত হচ্ছে করম উৎসব। পুরুলিয়ার ২০টি ব্লকের প্রায় ৩০টি জায়গায় আদিবাসী মানুষজন জড়ো হয়েছেন রাস্তায়। এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডহরে করম’। আদিবাসী কুড়মি সম্প্রদায়ের দাবি সেকশনাল হলিডে নয় রাজ্য সরকারকে সাধারণ ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করতে হবে করম সহ বাঁধনা,টুসু প্রভৃতি আঞ্চলিক উৎসব গুলিকেও।

অপরদিকে করম পরব উপলক্ষে আজই প্রকাশিত হচ্ছে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ফটোগ্রাফার পুরুলিয়ার ভূমিপুত্র স্বরূপ দত্তের একটি সাদা কালো ছবির অ্যালবাম নাম KARAM OF PURULIA

One thought on “মানভুমের করম পরব আসলে কী?

  • August 30, 2020 at 10:01 pm
    Permalink

    Janachilo na , khoob valo laglo. West Bengal e thekeo ajana oneker e

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *