বন্যপ্রাণ বাঁচাবে ইটভাটার সাঁওতাল শিশুরা

ওয়েব ডেস্কঃ

হাওড়ার শ্যামপুর ব্লকে রয়েছে বহু ইটভাটা যেখানে ভিনরাজ্য থেকে অনেক পরিযায়ী শ্রমিক বিশেষ করে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষজন দল বেঁধে এসে কাজ করেন ও স্থানীয় অস্থায়ী কলোনিতে বসতি তৈরি করে দিন গুজরান করেন। সারা বছরই ছুটোছুটির জীবনে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়ানোর সুযোগ থাকেনা তাদের। তার ওপর একটু বড় ও শক্তসমর্থ হলেই এই সব শিশুরা ইটভাটাতে বাবা মায়েদের সঙ্গে ইট তৈরির কাজে লেগে পড়েন। এভাবেই দারিদ্র, জীবন সংগ্রাম আর ইটের পাঁজার আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যায় শ্রমিকদের সন্তানদের শৈশব। হারিয়ে যায় স্বপ্ন, ঝলসে যায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আনন্দে বাঁচার আশা। সেই সঙ্গে অবসরে এলাকায় বন্যপ্রাণী শিকার করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার কাজে বড়দের সঙ্গে ছোট থেকেই পাঠ নেয় এই সব শিশুরা। নুন্যতম শিক্ষা না থাকায় এদের কাছে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল তার বিচার করার কোন সুযোগ থাকেনা। তাই শ্যামপুরের বিভিন্ন ইটভাটায় সমীক্ষা চালিয়ে সেখানকার পরিযায়ী শ্রমিকদের সন্তানদের অন্ধকারময় জীবনে আলো নিয়ে আসতে উদ্যোগী হল হাওড়ার একটি পরিবেশ মঞ্চ।

ওই মঞ্চের তরফে বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা শ্যামপুর বালিচাতুরী গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার আলিপুরের মিনার ইটভাটায় ২৬শে জানুয়ারি সেখানকার শ্রমিকদের কচিকাঁচাদের নিয়ে আনন্দের সময় কাটানোর উদ্যোগের আয়োজন করে। সকালে শিশুদের হাতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত, খেলাধুলা হয়। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়। শিশুদের হাতে চকোলেট, খাবার দাবার ও খেলার সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হয়। এই কাজে এগিয়ে আসে শহর হাওড়ার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অঙ্গনা ফাউন্ডেশন , এছাড়াও শ্যামপুরের একাধিক সামাজিক গোষ্ঠী, স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপের সদস্য সদস্যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। যাদের মধ্যে ছিল – আজকের দিনকাল, স্বপ্নতরী শ্যামপুর, অপরাজেয় প্রমুখ।

মূল আয়োজক ‘হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চে’র সম্পাদক শুভ্রদীপ ঘোষ জানান – “শ্যামপুরের বনাঞ্চলে মাঝে মাঝেই বেশকিছু মানুষকে বিলুপ্ত বন্যপ্রাণী শিকার করে নিয়ে যেতে ও খেয়ে ফেলতে দেখা যায়। খবর নিয়ে জানা যায় তারা সব স্থানীয় ইটভাটার আদিবাসী শ্রমিক। যারা শিকার উৎসবের বাইরেও অবসর সময়ে এই ভাবে শিকার করে বন্যপ্রাণী নিধনকার্যে লিপ্ত হন। এদের সাথে মাঝেমধ্যে ছোটদেরও তীর ধনুক বল্লম হাতে দেখা যায়। আমরা চেয়েছি ওই শ্রমিকদের শিশুদের মনে যাতে বন্যপ্রাণহত্যার প্রবণতা না দানা বাধে – সেই চেষ্টা করতে। ওদের অন্ধকার জীবনকে আলোয় ভরিয়ে তুলে, ওদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ফিরিয়ে দিতে। এই কাজ একদিনে সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে এই সব ইটভাটার শ্রমিকদের বসতিগুলোয় আমাদের এধরণের কর্মসূচি চালানো হলে – ওদের সহজেই আমরা বিলুপ্ত বন্যপ্রাণী শিকার করার ক্ষতিটা বুঝিয়ে তাদের এ থেকে বিরত করতে পারব”।

অঙ্গনা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার, তথা হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চের সহঃ সম্পাদক সম্রাট মন্ডল জানান – “আমরা শহরে বসে কেবল ওদের দারিদ্র নিয়ে আহা উহু করি, হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কিন্তু ওদের কাছে গিয়ে ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটাতে চাইনা। আমরা সবাই মিলে ওদের কাছে এভাবে বেশি বেশি যেতে পারলে ওরাও মনে জোর পাবে। ভাল কাজে ওদের লাগানো যাবে।”।
পরিবেশ মঞ্চের তরফে ওদের স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে যাতে ভর্তি করানো যায় তা নিয়েো খোঁজ খবর করা হয়। এই সব শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগ নেবার চেষ্টা করবে বলে জানান – শ্যামপুরের সমাজসেবিকা তথা পরিবেশ মঞ্চের রেসকিউ টিমের সদস্যা সঙ্গীতা গিরি সহ আরও অনেকে। শতাধিক শিশু কিশোর কিশোরিদের নিজে হাতে খাইয়ে খুব খুশি পরিবেশ মঞ্চের সদস্যা – প্রিয়া দাস, সর্পবন্ধু অনির্বাণ সেনাপতি সহ আরো অনেকে।

সব মিলিয়ে সুস্থ সমাজের লক্ষ্যে, সামাজিক পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চ যেভাবে সবাইকে নিয়ে শ্যামপুরের বিভিন্ন ইটভাটাগুলোতে সক্রিয়তা দেখাচ্ছে তাতে আশার আলো দেখছেন এলাকাবাসীরা। তারা প্রাণঢেলে আশীর্বাদ করেছেন মঞ্চের সকল কর্মযোগীদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *