আঁকাবাঁকা পথেই সোজা হাঁটার স্বাধীনতা খুঁজে গেলেন আজীবন, গাছবাবা

১৫র বিশেষ প্রতিবেদনঃ

শুভেন্দু আচার্য

কথায় বলে আপন থেকে পর ভালো আর পরের থেকে জঙ্গল। বাংলার এই বহু প্রচলিত প্রবাদ কে সত্যি করেছেন জিগর লোহার। ওরফে গাছবাবা। প্রায় বছর দশেক আগের কথা। কালচিনির রায় সুইটস এ বসে প্রাতরাশ সারছি। সেই সময়ে গাছ বাবার কথাটা বলল প্রদীপ লামা। জনপ্রিয় একটি নেপালি পত্রিকা স্থানীয় প্রতিনিধি। বলল, “দাদা যখন রায়মাটাং যাচ্ছেনই গাছবাবার সঙ্গে একবার দেখা করলে হয়না”? গাছবাবার নাম আগে যে শুনিনি এমনটা নয়। এর আগে আলিপুরদুয়ার সফরে এসে শুনেছিলাম। তাই দেখার আগ্রহ তো ছিলই। বললাম চলো এবার গাছবাবার দর্শন করেই আসি। কিছু শুকনো খাবার কিনে প্রদীপ আর আমার ফটোগ্রাফার রিণ্টাকে নিয়ে ড্রাইভার বিমল দা আর আমি রওনা হলাম রায়মাটাং এর পথে।

ডুয়ার্সের একেবারে শেষ প্রান্তে ভুটানের কোলে সিঞ্চুলা রেঞ্জ দিয়ে ঘেরা রায়মাটাং এর খ্যাতি মূলত নীলকন্ঠ পাখির জন্য। আর অবশ্যই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে। আয়তন মাত্র .১৮ বর্গকিলোমিটার। একটা সময়ে পর্যটকরা সরাসরি রায়মাটাং ঢুকতে পারতেন। কিন্তু এখন সীমা সুরক্ষা বল বা এসএসবির অনুমতি ছাড়া রায়মাটাং এ যাওয়া সম্ভব নয়। প্রায় অনেকগুলো চা বাগান আর বিজয়পুর বস্তি ছুঁয়ে আমরা রায়মাটাং এর দিকে চলেছি।পথে সরযুকান্তির সঙ্গে দেখা প্রদীপ স্থানীয় ভাষায় কথা বলে জানতে পারল একটা চিতা নাকি বিজয়পুর চা বাগানে কয়দিন ধরে খুব যাতায়াত করছে। তাই সব সময় আতঙ্কে আছেন ওরা। সেটা দেখা আমরা পাইনি। তবে রায়মাটাং ঢোকার মুখে জঙ্গলের মধ্যে একটা ময়না গাছের কোটরে গাছবাবার দেখা পেলাম।

ছবিঃ রিণ্টা দত্ত

জিগর লোহার। বয়স আনুমানিক .৫৮ বছর। ছোটখাটো, শান্ত, নিরীহ গোছের চেহারা গাছের কোটরে বসেছিলেন সে সময়। একটা বহু পুরনো ময়না গাছের কোটরে ধাপে ধাপে কাঠ দিয়ে তৈরি দোতলা তিনতলা এমনকি ৫ তলা পর্যন্ত রয়েছে। ওঠানামার জন্যে গাছের ডালের সিঁড়ি। তবে শহুরে সভ্যতার অনভ্যস্ত পায়ে অতিকষ্টে তিন তলা পর্যন্ত উঠতে পেরেছিলাম। তারপর আর চেষ্টা করি নি। গাছবাবা কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছর ধরে দিব্যি এভাবেই ওঠানামা করেন। তবে অন্ধকারে উঠতে গিয়ে পড়ে গিয়ে আঘাতও পেয়েছেন। তাই প্রৌড়ত্ব আর আঘাত দুটোই যেন চেপে ধরেছে তাকে?

“কেন থাকেন গাছে?” প্রশ্নটা শুনে খানিক চুপ করে রইলেন। তারপর শুকনো হাসি ছড়িয়ে আধা হিন্দি টানে যা বললেন, তার অর্থ- ছোটবেলা থেকেই রুগ্ন আরও অসুস্থতা জিগর লোহারের নিত্য সঙ্গী। সঙ্গে ভয়ঙ্কর দারিদ্র। বাবা-মা মারা গেছেন অনেক আগেই। সৎ মায়ের সংসারে বোঝা হয়ে ছিলেন। নিত্যদিন ঝগড়া, ঝামেলা লেগেই থাকত। তাই ধুত্তর বলে সবকিছু ছেড়েছুড়ে সটান জঙ্গলে ।প্রথম প্রথম বাড়ি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে। তারপর অনেক দূরে এই রায়মাটাং এর জঙ্গলে। “একা থাকেন ভয় লাগে না “? প্রশ্নটা করেই বুঝতে পারলাম বোকামি হয়ে গেল। বাইশ বছর ধরে যে লোকটা জঙ্গলকে তিলে তিলে আপন করে নিতে পেরেছে তার আবার ভয় কিসের! কিন্তু তবুও বন্ধু জন্তুদের ভয়। না গাছবাবার কোন ভয় নেই।

তবে এত দীর্ঘ বন্য জীবনে কি ভয় পাননি? একবার দলছুট একটা দাঁতাল হাতি তাকে তাড়া করেছিল। প্রায় পেড়েও ফেলেছিল। সেই সময় দৌড়ে কোনও মতে একটা পুকুরিতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। আরেকবার চিতার হাতে প্রাণ যায় যায়। আর শেষটা প্রায় বছর খানেক আগে। সতেরো আঠারোটা বাইসন, ভারতীয় গাউন ময়না গাছটা ঘিরে সারারাত দাপিয়ে বেড়িয়েছে। সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারেননি গাছবাবা। আসলে রাখেন বিন্দিয়া সিনি তো মারে কে! বিন্দিয়া সিনি হলেন কার্কিদের দেবী। প্রকৃতির দেবী। মূলত কার্কি সম্প্রদায়ের দেবতা হলেও পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা রায়মাটাং এর সমস্ত আদিবাসীরা মানেন এই দেবীকে। প্রতি তিন বছর অন্তর কুটো পুজোর দিনে প্রতিটি কার্কি পরিবার থেকে মুরগি বলি চড়ানো হয় বিন্দিয়া সিনির উদ্দেশ্যে। এতে সবার মনস্কামনা পূরণ হয়। জিগর লোহারের কোনও মনস্কামনা নেই। বাসনাও নেই। ইদানিং বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাও বোধহয় নেই। আলোচনা ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে দেখে সঙ্গে করে আনা কেক দিলাম, জল দিলাম। গাছবাবা পরম তৃপ্তিতে খেলেন। আচ্ছা রোজ কী খান? নাহ, গাছ বাবার এ নিয়ে কোনো হেলদোল নেই। ঠিক যেন রাজার অসুখ এর গল্পের ফকিরটার মতোই ওর জীবন। যেদিন জোটে খান। যেদিন জোটে না। সেদিন তো খাবার ঝামেলায় থাকেনা। শরীর অসুস্থ কিন্তু ডাক্তার দেখানোর সংগতি কোথায়? আগে রায়মাটাং পর্যটকরা দিতেন তাতেই চলে যেতে ওঁর। এদিকে পর্যটকদের আনাগোনা এখন খুবই কম। তাই মাঝেমধ্যেই জঙ্গল ছেড়ে দূরের গ্রামগুলোতে ভিক্ষা করতে যান। এছাড়া জঙ্গলের ফলমূল এটা-ওটা। এভাবেই কেটে যায় জীবন। আপনাকে দেখে মনে হয় অতীত আর ভবিষ্যৎ কে বেমালুম ভুলে শুধু বর্তমান টুকু নিয়ে দিব্যি আছেন।

পড়াশোনার ধার কাজ দিয়ে যাননি কোনদিনই। সৎ মায়ের সংসার ছেড়ে আসামের রঙ্গিয়া থেকে পালিয়ে এসে রায়মাটাং এর কাছে এই জঙ্গলটা পছন্দ হয়ে গেল। তাই এখানেই আস্তানা গেড়ে কেটে গেল জীবনের অনেকটা সময়। আবার যেদিন মন ছুটবে সেদিন হয়ত এই জঙ্গল ছেড়ে অন্য কোন জঙ্গলের গাছে ঠিকানা বাঁধবেন। তবে জঙ্গলে থাকা এখন হাজারো ঝামেলা। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, এসএসবি, এদের বারবার বারণ করা সত্ত্বেও গাছবাবা কিন্তু নাছোড়বান্দা। স্থানীয় বিডিও ভক্তবাহাদুর লামা নিজের চেষ্টায় বিজয়পুর বস্তিতে একটি ছোট ঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন গাছবাবাকে। জোর করে নিয়ে মাত্র দুদিন রাখতে পেরেছিলেন ওনাকে। তারপর আবার গাছ বাড়িতে ফিরে গেছেন গাছবাবা। আসলে জঙ্গল যে ওকে টানে। তাই লোকালয় থেকে দূরে, অনেক দূরে থাকতে চান তিনি।

দেশ বিদেশের কত মানুষ কত ইন্টারভিউ নিয়ে গেছেন তার। কত প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন ওকে? কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। আমিও কথা দিয়ে এসেছিলাম এই ইন্টারভিউ এর একটা কপি ওনাকে দেব। পড়তে পারেন বা না পারেন। অন্তত নিজের কাছে যত্নে তো রাখতে পারবেন। যদি কেউ পথ ভুলকরে গাছবাবাকে দেখতে যান। তাদের দেখাতে পারবেন। গত বছর জুন মাসের এক সকালে পাশের গ্রামের দুটি মহিলা জঙ্গলে কাঠ কুড়াতে গিয়ে গাছবাবাকে তার গাছের আস্তানায় মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন । জীবনের বাঁকা পথে চিরকাল সোজা ভাবে চলতে যাওয়া মানুষটা চিরতরে হারিয়ে গেলেন প্রকৃতির মাঝে। না, আমিও কথা রাখতে পারিনি। রাখতে পারলাম না।

শুভেন্দু আচার্য দীর্ঘ দিনের সাংবাদিক ও লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *