ঠুনকো অভিমান

সুমন জানা

আধো ঘুম আধো স্বপ্ন। মাঝে মধ্যেই দেখি। অনেক সময় অদ্ভুত মনে হয়, কখনও বা সারাদিনের আটকে থাকা কোডের সলিউশনটাও মিলে যায়, অনেক সময়। এবারেও তাই দেখলাম কয়েকটা ফ্ল্যাশব্যাক। সেশন আইডি, পেমেন্ট উইন্ডো, কার্ড ইনপুট ফিল্ডস, এক্সপায়ারি ডেট । জীর্ণ দরজা, মজবুত তালা, শুকিয়ে যাওয়া ডালপালা।

আর হ্যাঁ, তারপরেই ভেঙে গেল ঘুম টা। বিছানায় বসে বসেই জুড়ে ফেললাম ফ্ল্যাশব্যাক গুলো। অনেক সময় এরকম হয়। সব কোড ঠিক লিখেছি তবুও শেষমেশ পেমেন্ট টা ঠিক কমপ্লিট হচ্ছেনা। ‘এরর লগ’ চেক করে দেখলাম ‘সেশন আইডি’ টা ‘এক্সপায়ার’ করে গেছে। ওহ মাই গড। সঙ্গে সঙ্গে সেশন আইডি টা আর একবার দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে (ঠিক যেমনটি হয় গেম খেলার সময় ফেলিওর হলে) ‘জেনারেট’ করে ‘নিউ কার্ড ইনপুট’ দিতেই ‘পেমেন্ট সাকসেস’! অমনি একগাল হাসি। সঙ্গে আরো দু-একটা তবলার বোল বাজিয়ে নিলাম কম্পিউটার টেবিলের ওপরেই। হ্যাঁ, বিষয়টা কিছুই না। খুবই সামান্য একটা ব্যাপার ওই ‘সেশন আইডি’টা।

জীর্ণ দরজা, মজবুত তালা আর শুকিয়ে যাওয়া কিছু বুনো জংলি গাছের ডাল-পালা! দরজাটা বহু বৈশাখের প্রখর রোদে জ্বলে-পুড়ে আর বর্ষার জলের ঝাপটায় আজ জীর্ণ। তার মধ্যে আর নেই কোনও প্রতিরোধের ক্ষমতা। সেটা অনায়াসেই ঠেলে ভেঙে দিয়ে সেই সুন্দর বাড়িটির মধ্যে প্রবেশ করাই যায়। কিন্তু কেউ সেই দরজায় যায় না।
কেন জানো?
কারণ ওতে যে তালা লাগানো আছে গো!
হাঃ হাঃ হাঃ!
অদ্ভুত এই ছোট্ট একটা মজবুত তালা অনেকটা সেই ‘পেমেন্ট গেট ওয়ে’র ‘সেশন আইডি’র মত।

আমাদের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন, বনিবনা, মতান্তর, ভুল বোঝাবুঝি আর সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করাটাও অনেকটা ওই ‘সেশন আইডি’ আর জীর্ণ দরজায় শক্ত তালার মতন তুচ্ছ। অনেক বছর আগেকার সেই সুন্দর বাড়ি আর তার প্রবেশ দ্বারের মতই ছিল সম্পর্কগুলো; সাবলীল এবং স্বচ্ছন্দ, কথা বার্তাও চলত ওই প্রবেশ দরজাটার মতন। তারপর ওই যা হয়। কিছু মতান্তর আর কিছুটা আত্ম-অহংকারে নিজের সম্মান আর আত্ম সম্মানের মধ্যে সমতা বিধান করতে না পেরে বন্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক আলাপ, কথাবার্তা। সম্পর্কের দরজায় তালা দিয়ে দেয় দুই পক্ষই। অর্থাৎ কেউই ওই দরজায় প্রবেশ করবেনা, কথা বলবেনা।

তারপর দিন যেতে থাকে। সময়ের সমুদ্রে বয়ে চলে সকলেই। সাথে কুড়িয়ে নিতে থাকে কিছু ঝিনুকের মতো অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের নুড়ি পাথর। বহু বৈশাখের বহু জ্বালা যন্ত্রনা সয়ে, শোক আর অভিজ্ঞতা নিয়ে বইতে থাকা মনেও কিন্তু সেই পুরানো ক্ষতটা আরও জীর্ণ হতে থাকে। শুধু কোথাও অবচেতনে সেই মজবুত তালাটার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় কেউ। যখন দুইজনেই ভুলে যায় মতান্তরের কারণ, কথা না বলার কারণ। শুধু মনে রাখে আমি ওর সাথে কথা বলব না।
সেই ‘সেশন আইডি’ আর মজবুত তালাটির মতন।
অনায়াসে দু’জনেই সেই জীর্ণ দরজা ঠেলে প্রবেশ করতেই পারে সেই সুন্দর গৃহরূপ সম্পর্কটার মধ্যে। আর ওই শুকিয়ে যাওয়া বুনো ডালপালা গুলো অতীতের সমসাময়িক মনের কিছু ক্ষোভ আর বিদ্বেষ।

সুমন জানা। জন্ম ১৯৮৭ সাল। শৈশব এবং বড় হয়ে ওঠা হাওড়া জেলার বাগনান থানার গ্রামে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত কলা বিভাগের ছাত্র হয়ে পড়াশুনা করেন গ্রামেরই স্কুলে। তারপর কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে কলকাতায় ডিপ্লোমা। কর্ম সূত্রে কলকাতার একটি বেসরকারি সফটওয়্যার সংস্থার সাথে যুক্ত। মনেপ্রাণে ভালবাসেন খাঁটি বাঙালিয়ানা। শখ গল্পের বই পড়া, গল্প শোনা এবং লেখালেখি। এছাড়াও গান বাজনা এবং তবলা বাজানো অবসর যাপনের সঙ্গী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *