শৃঙ্গ আর সমতলের গল্প

ডাঃ সৌমিত্র চ্যাটার্জি

শহরে বসন্ত এখন আর সেভাবে দানা বাঁধে না। সাজগোজ করে এসে বসে না পাশে। হুট করে চলে আসে গ্রীষ্ম। কৃষ্ণচূড়া লোহিমা সাজাতে না সাজাতেই সাদার শান্তি অথবা বৈধব্য। আসলে যে যেভাবে দেখে আর কি !!

আমি দেখতাম। অসম্ভব প্যাশান নিয়ে জীবন কে দেখতাম। কৃষ্ণচূড়া প্রতিবেশী ছিল। ফুটবল খেলে ফেরার সময় পায়ের দাপাদাপিতে নিষ্পেষিত ঘাসটুকু মন খারাপ করাত। আহা বেচারা…

এইসব বেচারা দের ছুঁতে গিয়ে কবে যে বেলা বয়ে গেল !! সাজানো হলো না অলিন্দ, উঠোন, বাগানের অনিন্দ্য। ছোঁয়া হলনা কবিতায় কাপলেট অথবা জীবনের মন্তাজ। ঘুমের মধ্যে নিরাকার এসে ডাকে, বলে জাগো !! আমি পাশ ফিরে শুই। এক মাতাল ঘূর্ণি ঠেলে ভোর হয়। ঘোলাটে এক সমতলে সূর্য ওঠে। পৃথিবী জাগে, শুরু হয় কলরব, জিঘাংসা, অতিমাত্রিক বীভৎসতা। আমার ভোরের সূর্য্য কদর্য তুলিতে লাল হয়।

বেঁচে থাকা এক বিন্দু-র নাম। কৈবর্ত্যের মত, অয়োগবীজাত এক বিজাতীয়। অসংখ্য বুদবুদ, কে কতটা স্থায়ী তার ওপরই সুখ শান্তির মাপকাঠি। যেখানে, ” কাদম্বিনী মরিয়া প্রমান করিল সে মরে নাই “।

তবু বেঁচে থাকা এক অভ্যাস। রঙ চিনে চিনে মানুষ চেনার নেহাতই এক আত্মপ্রসাদ। বালিশে মাথা দিয়ে যন্ত্রনা আর দুর্ভিক্ষের ঘুম। চুরি হয়ে যাওয়া বেঁচে থাকাতেই নিঃসঙ্গ এপিটাফ।

তবু বেঁচে থাকা এক অমূল্য সংবেদ। এক নির্বিকল্প উড়ান। কত আরাম, আদর, মুহুর্ত ছোঁয়া নরম মিশে থাকে আটপৌরের হাত ধরে। আমিও যেতাম সেরকমই এক অভিসারে। যাবার আগে এক বুক ধুকপুক। কখনো কুমকুম, কখনো মেহেন্দি, কখনো ঘুমের অধরে সপাট চারচোখ।

রাত তিনটে। হেডলাইট এর আলো পড়ছে জমাট সাদা বরফের ওপর। ক্রাম্পনের ধারালো দাঁত শ্বাপদের মত কামড়ে ধরছে আইস মাস। মচমচ শব্দ আর হাওয়ার বেলেল্লাপনা ছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ। ঘন ঘন নিঃশ্বাসের পালমোনারি রুটমার্চ বড় ব্যাক্তিগত। একবগ্গা উঠে চলা অসম্ভব জেদের হাতে হাত রেখে। জীবন ছুঁতে চায় শিখর কে আর শিখর বলে… আয়… আয়।

চলেছি রুদ্রগয়রা শৃঙ্গ অভিযানে। অ্যাডভান্স ক্যাম্প থেকে সরাসরি শৃঙ্গ অভিমুখে। এসব সময় বড় নিজের। প্রিয়জন, পরিজন সব ছেড়ে এক উন্মুক্ত আনন্দের সন্ধানে চলা। নিকষ হিমেল রাত, চাঁদের লাবণ্য, আকাশের অন্ধকারে হয়ে ওঠা আলোর ফিকে সালতামামি সব মিলিয়ে এক অতিপ্রাকৃত বিনম্রতা. চুপিচুপি সেই টাকিলা আমি তারিয়ে তারিয়ে পান করি।

“ডাক্তার, রোপে টান পড়ছে “, কৃষ্ণেন্দু ইষৎ বিরক্ত। হবারই কথা। হাই অল্টিটুড বিলাসের জায়গা নয়। রাজা হবার হরেক উপকরণ সাজানো চারপাশে। তবু তমোগুণ এখানে অমার্জনীয়। “মিছে টাকাকড়ি, মিছে ঘরবাড়ি “, সে ফকির হওয়া আমার সাধ্য কই? তাই কল্পনার মসনদে বসা, বাদশা সাজা, আপন ভুবন গড়া। স্বাভাবিক ভাবেই এইসব বিলাসিতা এরকম মুহূর্তে দলের পাবলিকদের কাছে ঝাঁট জ্বলার কারণ হয়। চাপা কাঁচা খিস্তিও হালকা ভাবে কানে ভেসে আসে কখনো। পরিস্থিতির বিচারে ক্ষমা করে দি। জানি এরাই আবার টেন্টে ফিরে আবেগে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলবে।

আমাদের পাড়ায় তড়িৎ দা কে দেখেছি ছোটবেলায়। একটা পা টেনে টেনে চলতো। হিন্দোলিয়ামের টিফিনবক্স প্লাস্টিকে মুড়ে নিয়ে বড়বাজারে কাজে যেত কুঁচকে যাওয়া একটা জামা আর রঙ ওঠা প্যান্টে। ছুটির দিনে আমাদের মধ্যমনি। যত জিতে যাওয়ার গল্প করতো। সারাক্ষণ হাসিমুখ। যেন জীবনে কোনো “অসুখ” নেই। আসলে জীবনে হেরে যাওয়া মানুষ তো। তাই জিতে যাওয়ার গল্পগুলো নিজেকেই শোনাতো। আমরা ছিলাম নেহাতই “অডিয়েন্স”। পাকস্থলীর ক্যান্সারে হেরে গেছিলো তড়িৎ দা। আমরাও সবাই কোথাও না কোথাও তড়িৎ দা। জীবনের কোনো না কোনো খেলায় হেরে গেছি। তবু জেতার আস্বাদ বড় মধু। আমার “সে” ছড়িয়ে থাকে পাহাড় থেকে পাহাড়ে। অসংখ্য উত্তেজনা, শীৎকার, স্বেদ আর নীরব কান্না জমে থাকে জমাট বরফে। এখানে অহংকারী নয়, হেরে যেতে ভালো লাগে। “হে চরাচরের নির্জনতা, আমি কোনো দোষ করিনি আমায় ক্ষমা কোরো। ”

ভোর প্রায় পাঁচটা। রঙ চিনছে পাহাড়। রুপোলি থেকে সোনালীর চোরা উচ্ছাস জাগছে। দম ফেলতে বড় কষ্ট। পায়ের এডাপ্টার আর হ্যামস্ট্রিং মাংসপেশী জানান দিচ্ছে। পায়ের আঙ্গুল বরফে দীর্ঘক্ষণ ডুবে থেকে সাড়হীন। আর একটা রিজ পেরোলেই কাঙ্খিত শীর্ষ। দেখা যাচ্ছে সে অধরা। লাল হলুদের নিবিড় চুম্বন সারা আকাশের আঁচলে।

যেকোনো শীর্ষের কাছে শেষ কয়েকটা স্টেপ ঐ “খোকা 420″। আনন্দ উত্তেজনায় হালকা কেলো হবেই। সবারই কম বেশী হয়। কেউ স্বীকার করে কেউ চেপে যায়। গঙ্গোত্রী ২ শীর্ষ অভিযানে প্রায় মেরে এনেছি, শীর্ষ ভাত বেড়ে ডাকছে, সেই সময় অনল একটু ডানদিক দিক চেপে এসে (ও আবার ঘোরতর বামপন্থী) প্রায় কানে কানে আমায় বললো, ” বস, আর পারছি না “। আমিও ভাবলাম খুব স্বাভাবিক এ সময়ে। চাঙ্গা করার জন্য বললাম, “আরে মেরে এনেছি তো ” (নিজেও কিন্তু হেদিয়ে গেছি )। ও করুন মুখে বললো, “কিন্তু আমার হেভি পটি পেয়েছে “। আমার স্নায়ুতন্ত্র বললো ” লে ছক্কা “। পাশ দিয়ে স্বর্ণেন্দু টলতে টলতে বেরিয়ে যাবার মুখে হাঁফাতে হাঁফাতে পাঞ্চ লাইন টা ছেড়ে গেল, “নে, সাদা হলুদ করে দে…. “।

শীর্ষ ছোঁয়ার এসব গল্প লেখা হয় না। শুধুই বিজয়ীর আস্ফালন। লিখতে গেলে মনোমালিন্যের সম্ভবনা যথেষ্ট। তবু স্বল্পজনের মাঝে ছড়িয়ে দি মাঝেসাঝে। মেঘবালিকা আর চিলেকোঠার গল্প যে বড় চিরন্তন। সেখানে আটপৌরে রঙ না থাকলে ভালোবাসাই অপূর্ন।

শেষ পদক্ষেপ। মুক্তি আর আবেগের অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ। শীর্ষ…. “আদরে আঙ্গুল ঠোঁট ছুঁল তোর / ভালোবাসি, মুহুর্ত তোর “। ক্যামেরা, ফ্ল্যাশ, জাতীয় পতাকা, আকাশে আবীর, কাউকে মনে পড়া, ঝাপসা চোখ, আদিগন্ত নীলিমা, নিচে সাদা মেঘের দরবারী…. ওওওও তড়িৎ দা….

কখনো দেখা হয় নি, তোমার হিন্দোলিয়ামের টিফিন বাক্সে কী টিফিন ছিল। জানা হয়নি কেন ডাকতে “এই যাযাবর”।

সৌমিত্র চ্যাটার্জী, বরানগর এর বাসিন্দা। পেশায় চিকিৎসক। আবাল্যের পাহাড় প্রেম ক্রমশঃ পরিণতি পেয়েছে। পাহাড়কে আরো কাছ থেকে দেখার অদম্য আগ্রহে পাহাড়ের অন্দরে প্রবেশ করেছেন। তারপর নানা মণিমুক্তোর সঞ্চয় স্মৃতির আলেখ্যকুঞ্জিকায়। তবে নিজের লেখক সত্ত্বা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেন, “লেখক হবার যোগ্যতা আমার নেই। নেহাতই এক কথক।”

2 thoughts on “শৃঙ্গ আর সমতলের গল্প

  • October 7, 2020 at 1:33 pm
    Permalink

    সৌমিত্র দা, যদিও জানা নেই যেহেতু আমি ফেসবুকে নেই, তাই এই লেখা পড়ে অনুভূতির প্রকাশ স্বরূপ.. আমার গুটিকয়েক শব্দ তুমি দেখতে পাবে কিনা। সে হোক গে, ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসাও তো দেখা যায় না। তবে তার অনুভব তো আছে। সেই অনুভূতি নিয়ে লিখলাম… সত্যি শহর এখন বসন্তহীন। শহর রাতে আর রাত জাগে না। এখন খুব নিয়ম মাফিক শহরতলির কোকিলের গান।

    তবে রুদ্রগয়া হোক কিমবা পানপাতিয়া পড়তে বসলে ঋতুরঙ্গের ছবি মননে তুলি বোলায়। ছবি থাকে শেষ ছবি হয়ে। তাই বারবার এমন কিছু পেলে জমা করি একটু অন‍্য বসন্ত খোঁজে।

    কিছু লেখা জীবন কে বুঝতে অন‍্যভাবে ভাবায়, আর কিছু লেখা জীবনের গান শোনায়। আমার কাছে এই লেখা দুটির মেলবন্ধন। তাই শিখতে আসি, বুঝতে আসি।

    আসলে শ্রদ্ধেয় তড়িৎ দা, ভালোবাসার সন্দীপদা, কিম্বা আদরের সম্বোরণ-রা কোন এক বিকেলের শেষ আলোয়, মা গঙ্গার নরম জলে যতই শেষ সাঁতার দিকনা কেন, তাঁদের নিখুঁত হাসির স্বাধীনতায় …এক কাপ মাটির ভাঁড়ে চা মনে লেগে থাকে ও থাকবে।

    আমার কাছে তাই এই ধরনের লেখা গুলি শুধু লেখা না হয়ে ভ্রাম্যমাণ স্মৃতিক্ষরণ। যা ধারণ করে চিরবসন্তের আবেশে আরাম পাওয়া যায়।

    তাই এক আকাশ ভালোবাসা দিয়ে গেলাম লেখা টিকে। পরম যত্নে আদর পাক বারে বারবার।

    ভালোবাসা সহ সুমন। 💝💝💝

    Reply
  • October 7, 2020 at 7:44 pm
    Permalink

    খুব মূল্যবান তোর এই মূল্যবোধ আর এই মূল্যবান লেখা টুকু. অনেক আদর রইলো. ♥️

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *