জগন্নাথ নয় ৩০০ বছর ধরে রথারুঢ় রামচন্দ্র শান্তিপুরে গোস্বামী বাড়িতে!

কোয়েল পাল

শান্তিপুরের বড়গোস্বামী বাড়ির রথযাত্রা প্রায় ৩০০ বছরের পুরানো। কথিত আছে হুগলীর গুপ্তিপাড়ার জানকীনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র রাজবল্লভ চট্টোপাধ্যায় ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানির (East India Company) ‘দেওয়ান’ পদে অভিষিক্ত হন। বিবাহের পর কর্মসূত্রে তিনি শান্তিপুরে থাকতেন। এই চট্টোপাধ্যায়দের বাড়িতে ধুতি চাদর পরিহিত দূর্বাদল শ্যাম গাত্রবর্ণের (গাঢ় সবুজ) পদ্মাসনে উপবিষ্ট রঘুনাথ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রতিবছর এই রঘুনাথের রথযাত্রা উৎসব মহাসমারোহ পালিত হত। চট্টোপাধ্যায়রা শান্তিপুর ছেড়ে যখন পাকাপাকি ভাবে অন্যত্র বসবাস করতে শুরু করেন তখন তাঁদের সেবিত রামচন্দ্রে বিগ্রহ সহ রথখানি বড়গোস্বামীদের হাতে তুলে দেন। তখন থেকেই বড়গোস্বামীরা যথোচিত মর্যাদায় এই রথোৎসব পালন করে আসছেন।

মূলত রঘুনাথ বা শ্রীরামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া লোহার তৈরি এই রথ, ক্রমে শান্তিপুর বাসীর কাছে ‘রঘুনাথের রথ’ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। রথটির উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট, ৯টি চূড়া এবং ৯টি লোহার বিশালাকার চাকা। অতীতে রথটির উচ্চতা আরও বেশি ছিল, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের ফলে রথের উচ্চতা আগের থেকে এখন অনেকটাই কম। অতীতে এটি শুধুমাত্র শ্রী রামচন্দ্রের রথ হিসাবে বিবেচিত ও উদযাপিত হলেও কালক্রমে এর সঙ্গে যুক্ত হন বড় গোস্বামীদের সেবিত জগন্নাথ,বলভদ্র এবং সুভদ্রাদেবীর বিগ্রহ। রথের একদম ওপরে শ্রীরামচন্দ্র সহ জগন্নাথ-সুভদ্রা ও বলভদ্র দেবত্রয়ের মূর্তি বসানো হয়। প্রতিবছর রথযাত্রা উপলক্ষে রথটিকে নতুন ভাবে রং করা হয়। কাপড় ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হয়।

রথযাত্রার দিন সকালবেলা বড় গোস্বামী বাড়ির নাটমন্দিরে শ্রীরামচন্দ্র এবং জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার বিগ্রহকে হাওদায় বসিয়ে বিশেষ পূজা অর্চনা করা হয়। পূজা শেষে রঘুনাথ, জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে কাঁধে তুলে খোল,করতাল,হারমোনিয়াম,শঙ্খ,উলু বাজিয়ে কীর্তন করতে করতে রথে আনা হয়। রথ প্রাঙ্গণে দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয় নৈবেদ্য। কীর্তনে আর খোলের বোলে রথকে কেন্দ্র করে পরিক্রমা শুরু করেন বৈষ্ণব ভক্তমণ্ডলী। রথের দড়িতে লাগে টান। শুরু হয় নগর পরিক্রমা। ভক্তেরা জয় ধ্বনি দেন
“আর বল আছে?
বল থাকতে বল দেয় না
দোহাই শ্রী রঘুনাথের কাছে…”

এই করোনা (Coronavirus) আবহের আগে পর্যন্তও রঘুনাথের রথকে কেন্দ্র করে শান্তিপুরের অদ্বৈত সড়কের দুপাশে বসত বিরাট রথের মেলা। রথপরিক্রমা শেষে সন্ধ্যা নামলে রঘুনাথ, জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার বিগ্রহগুলিকে রথ থেকে নামিয়ে নামসংকীর্তন সহযোগে ভক্তগণ নিয়ে আসেন। শান্তিপুরে রঘুনাথের পৃথক কোন গুন্ডীচা মন্দির না থাকায় গর্ভমন্দিরে যেখানে রামচন্দ্র সারাবছর থাকেন সেই মন্দির ব্যতীত অন্য একটি মন্দিরে রামচন্দ্র সহ জগন্নাথ,বলদেব এবং সুভদ্রাদেবীকে রাখা হয়। তারপর থেকে অপেক্ষা শুরু উল্টোরথের। উল্টোরথের আগের দিন বড়গোস্বামী বাড়িতে শ্রীশ্রীরামচন্দ্রকে ‘দ্যাওড়া’ ভোগ নিবেদন করা হয়।

শ্রী চৈতন্যদেব (Sri Chaitanyadev), শ্রী অদ্বৈতাচার্য্য, শ্রী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, বাংলা ভাষায় রামায়ণ রচয়িতা কবি কৃত্তিবাস ওঝার (Krittibas Ojha) স্মৃতি বিজড়িত শান্তিপুর বীর আশানন্দ, কবি করুনানিধান বন্দোপাধ্যায়ের জন্মস্থান। শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের মিলনক্ষেত্র এই মন্দির নগরীতে জগন্নাথ আর রঘুনাথ মিলে মিশে ভক্তি রসের এক অন্য ফল্গুধারা প্রবাহিত করছে তিন শতক ধরে।

ছবিঃ পিনাক প্রামানিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *