স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ – বারানসী, আগ্রা,ফতেপুর সিক্রি টই টই

১৫র বিশেষ প্রতিবেদনঃ

অপূর্ব মিত্র

সুদীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ব্যাঙ্কের তবিলদারি করে বছর খানেক হল অখন্ড অবসর। আর সাম্প্রতিক অতিমারীর তান্ডবে বর্তমানে গৃহবন্দী – যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো আর স্বেচ্ছাধীন নয়। তবে এই পরিস্থিতি বাড়ির দরজায় আগল দিলেও, মনের জানালা দিয়েছে খুলে । সেই জানালায় বসে অতীত স্মৃতির জাবর কাটা নেহাৎ কম উপভোগ্য নয়। তাই বিষয়গুলি ধরে পরিবেশনের চেষ্টা মাত্র।  কর্মজীবনে বিভিন্ন জায়গায় বিস্তর ঘোরাঘুরি করেও এমন রোমাঞ্চ কখনো জাগে নি, যেমনটা ছিল শুরুর সেই দিনগুলোয়। 

সময়টা গেল শতকের সাতের দশকের শেষ প্রান্তে। কলেজের পাঠ চুকিয়ে সদ্য কৈশোর পেরোনো তারুন্য তখন প্রতিষ্ঠা পাবার লড়াইয়ের জন্য ওয়ার্ম আপ করে নিচ্ছে। পিঠোপিঠি সঙ্গী চন্দননগরে আমাদের পাশের বাড়িরই তপন মুখার্জী ওরফে মন্টু। মন্টুর কলেজ কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স আর আমার চন্দননগর হলেও দৈনিক ওঠাবসা, আর উঠলো বাই তো কটক যাই ভাবনাগুলি মোটামুটি একই খাতে বইত। ওর কলেজ যাবার সুবাদে পরিচিত কলেজ স্ট্রীট পাড়া থেকে একদিন ব্যাঙ্কের পরীক্ষার বই-ও এনে ফেলল। সেই বই নিয়ে তখন দু-জনের অনুশীলন চলতে লাগল। তবে সে অবশ্যি রাতের বেলা। কারণ দিনের বেলা আমরা ভীষণ ব্যাস্ত। ইতিমধ্যেই আমরা স্বাধীন ব্যবসা ফেঁদেছি। জেনারেল অর্ডার সাপ্লাইয়ের প্যাড ছাপিয়ে ইট, বালি, চুন, সুরকি, ঘ্যাঁস ইত্যাদি সরবরাহের কাজ। দিনের বেলায় ব্যবসা, আর রাতে পড়াশুনা। মাঝে মাঝে এখান ওখান পরীক্ষায় বসা। এমনি একদিন ঠিক করলাম এবার বেনারসে ব্যাঙ্কের পরীক্ষা দিতে যাব। তখন বেনারস ছিলো বি.এস.আর.বি-র সেন্ট্রাল সার্কেলের এর অধীনে। যদিও অর্ডার সাপ্লাই করছি, তবুও বেকার বলেই মনে হত। তাই যেকোনো একটা বাঁধা মাইনের কাজ চাই-ই চাই। সেই তাড়না থেকেই বেনারস পরীক্ষা দিতে যাবার ভাবনা। বাড়িতে পেড়েও ফেললাম সে কথা। কিন্ত কিন্তু করে অনুমতি পেতেই শুরু হল পরিকল্পনা। মুক্ত হবার চিন্তাতেই ঘোরতর উত্তেজনা। তাছাড়া পরীক্ষা তো ছুতো। এই সুযোগে উপরি বেনারস ভ্রমণ। প্রায় প্রতিদিনই আমরা পড়ার পর প্রায় এক ঘন্টা বেড়ানোর রুট ম্যাপ আর আনুমানিক খরচ খরচার হিসাব নিয়ে বসতাম।  সে বছর দূর্গা পুজোর কয়েক দিন আগে আমাদের পরীক্ষার দিন পড়ল।

জামা কাপড় টিনের ট্রাঙ্কে ভরে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছি। আমার ট্রাংকটা আকারে ছোটখাট হলেও মন্টুরটা ছিল অপেক্ষাকৃত বড়। আমার সাড়ে তিনশো আর মন্টুর সাড়ে চারশো মিলে ভ্রমণের জন্য আমাদের মোট পুঁজি জোগাড় হল সাকুল্যে আটশো টাকা। এদিকে মোটামুটি দিন পনেরর প্রোগ্রাম ছকে রেখেছি। সুতরাং ট্রেনের টিকিটের জন্য খরচ নৈব-চ। অতএব চন্দননগর স্টেশনের সেই সময়কার টি.টি লালন সিং-এর শরণাপন্ন হলাম। তিনি থাকতেন চন্দননগরের রেল কোয়ার্টার-এ। তাকেই ফিট করলাম। ব্যাস নিশ্চিন্ত। এবার মাঠে নেমে পড়লেই, থুড়ি ট্রেনে চড়ে পড়লেই হল।

অবশেষে আমাদের যাত্রার দিন ঘনিয়ে এলো। এদিকে পকেটে টিকিট নেই। লালন সিং কথা রাখলে হয়। সকাল থেকেই আমাদের মধ্যে একটা চাপা টেনশন কাজ করছে। একবার লালন সিং এর কোয়ার্টার থেকে শুকনো মুখে মন্টু ঘুরেও এল – লালন কোয়ার্টারে নেই। সন্ধ্যাবেলা চন্দননগর থেকেই দুন এক্সপ্রেসে উঠতে হবে। রাতের খাবার সন্ধ্যেতেই সাঙ্গ করে টিনের বাক্স দুলিয়ে বিনা টিকিটে হাজির হলাম দুই বেনারস-যাত্রী। অন্যান্য যাত্রীদের ভীড় বাড়ছে প্ল্যাটফর্মে। লালন সিং-এর দেখা নেই। এক সময় দুন এক্সপ্রেসের আসার ঘোষনাও হয়ে গেল। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে এক সময় কালো কোট পরিহিত লালন সিং-কে দূর থেকে দেখতে পেয়ে বুকে বল পেলাম। লালন সিং এলেন।  আমাদের জন্য দুটো প্লাটফর্ম টিকিট কেটে এনেছেন। প্ল্যাটফর্ম কাঁপিয়ে দুন এক্সপ্রেস ঢুকছে আর লালন সিং আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলেছেন প্ল্যাটফর্মের সামনের দিকে। ট্রেন থামতেই হাতে প্ল্যাটফর্ম টিকিট দুটো ধরিয়ে তিনি আমাদের উঠিয়ে দিলেন সামনের ব্রেক ভ্যানে – ব্যাস। উঠেই আমাদের পায় কে! ব্রেক ভ্যানের কাঠের মেঝেতে আগে থেকেই কেউ বিচালি বিছিয়ে রেখেছিল। ট্রাঙ্ক দুটো এক জায়গায় সেট করে ফেললাম। আর ঠিক করলাম এখানে আর কাউকে উঠতে দেওয়া যাবে না। ব্রেক ভ্যানের দরজা দিলাম লক করে। তারপর সেই বিচালির গদিতে আরাম করে বসলাম।

ইতিমধ্যে হৃৎপিন্ডের স্পন্দন বাড়িয়ে ট্রেন গতি নিয়েছে চন্দননগর ছেড়ে। বুঝলাম ভিতরের উত্তেজনা। এতক্ষণ ট্রেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছিল বলে প্ল্যাটফর্মের আলোয় বোঝা যায় নি। ব্রেক ভ্যানের ভিতর কোন আলোর ব্যবস্থা নেই। দরজা সম্পূর্ণ লক করায় এখন আর বাইরের আলো তেমন ঢুকছে না।  অন্ধকার কাটাতে মন্টু ততক্ষণে একটা বিড়ি ধরিয়েছে… এমন সময় ঝুপসি অন্ধকার কোন থেকে দেহাতি ভাষায় মিনমিন করে কে যেন একটু আগুন চাইল। দুজনেই আঁতকে উঠেছি। আবার আগুন চায়। ধাতস্থ হতে সময় লাগল। মন্টু ফস করে আরেকটা দেশলাই জ্বালাতে দেখা গেল আমাদের আগে থেকেই আরো দুটি প্রাণী ডিব্বায় উঠে বসে আছে। আমাদেরই মত তাদেরও গন্তব্য – মুঘলসরাই। ট্রেন এক সময় বর্ধমান পৌঁছাল। প্ল্যাটফর্মে দেখি পুরী ভাজা হচ্ছে আর দুইজন মিলে সব্জী সহ শালপাতায় মুড়ে দশটা পুরী হামলে পরা ট্রেন যাত্রীদের সাপ্লাই দিয়েই যাচ্ছে। বড় স্টেশনগুলির প্ল্যাটফর্মের এ বোধহয় চিরন্তন ছবি। পকেট বাঁচাতে আমাদের রাতের খাওয়ার পাঠ বাড়িতেই সেরে এসেছি, তাই পুরী-সব্জীর দিকে নজর দিয়ে লাভ নেই। যাই হোক, আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কোনোমতেই কাউকে উঠতে দেওয়া বা দরজা খোলা যাবে না। অনেকে ওঠার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু না, আমরা এলাও করলাম না।  

ট্রেন একসময় বর্ধমান ছেড়ে রওনাও দিল। ট্রেনের দুলুনিতে ঘুম ঘুম আসছে।  ঘুটঘুটে অন্ধকারে আলো হবে বলে নাকি মন্টু মাঝে মাঝেই বিড়ি ধরাচ্ছিল। পরের স্টপেজ আসানসোল। আসানসোল প্ল্যাটফর্মের সামনের দিকে কোনো আলো ছিল না। ট্রেন পৌঁছাতেই কিছু লোক দরজা ধাক্কা দিচ্ছিল।  আমরা প্রি-ডিটারমাইন্ড – উঁহু নট এলাও। কাউকেই নয়। আর ভাবছি ট্রেনটা তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলে বাঁচি। কিন্তু হায়! শেষ রক্ষা বোধহয় হল না। ট্রেনটা ইঞ্জিন পাল্টানোর জন্য অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষন পরে দেখি, বড়ো সার্চ লাইট নিয়ে জি.আর.পি আর টি.টি. কে সঙ্গে নিয়ে কিছু লোক আসছে। অগত্যা দরজা খুলতে বাধ্য হলাম। টি.টি. আর পুলিশ এসে দরজা খোলালো। ওই বড়ো টর্চ জ্বালিয়েই আমাদের পঞ্চাশ টাকা ফাইন করলো। মনের এতক্ষণের ফূর্তিটা কিছুটা ফিকে হয়ে গেল। যতটা না পুঁজিতে হাত পড়ায়, তার থেকে বেশি বোধহয় ব্রেকভ্যানে এতক্ষণের রিজার্ভড অনুভুতিতে ছেদ পড়ায়। বাকি রাতটুকু নিস্তরঙ্গভাবেই বয়ে গেল।

সকাল ৯ টা কি ১০ টা হবে, ঠিক মনে নেই, আমরা মুঘলসরাই জংশনে পৌঁছাতে রাতের সাময়িকভাবে হৃত উত্তেজনা বেশ ফিরে পেলাম। এখানেই নামতে হবে, কারণ দুন এক্সপ্রেস বেনারস স্টেশন যায় না। এ গাড়ী সে গাড়ীর অনবরত ঘোষণা, লোকের ট্রেন বদলানোর হুড়োহুড়ি আর পুরী-সব্জীর হাঁকডাকে স্টেশন সরগরম। যাই হোক  ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতেই হবে, গেটে আমাদের টিকিট কেউ চেক করলো ন। স্টেশন-এর বাইরে এসে দেখি সার সার অটো। সাড়ে সাত টাকা করে ভাড়া রফা করে তারই একটার ভিতর বাক্স সমেত সেঁধিয়ে রওনা দিলাম বেনারস। স্বামী বিবেকানন্দের সেই ‘বার্ধক্যের বারানসী’। বহু রসসিক্ত বাঙালীর মতই আমদের কাছে বারানসী হয়ে গেছে বেনারস। তবে অনেকেই প্রাচীন কাশী শহরের নামেই ডাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।  

অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত বেনারস। রাস্তায় ভীড় মোটামুটি। বেশ একটা ব্যাস্ত ব্যাস্ত ভাব। এবার থাকার একটা ব্যবস্থা চাই। পায়ে পায়ে হাজির হলাম রামকৃষ্ণ মিশনে। কিন্তু জায়গা হল বারান্দায়। আমরা রাজী হলাম না।  কারণ আমাদের কাছে এডমিট কার্ড আর প্রচুর টাকা (!)  কিন্তু যাব কোথায়? মন্টু এ-দেশীয়। ওদের আদি বাড়ি বাঁকুড়ার ভাগবাঁধে। ওর কোনো এক দূর সম্পর্কের দিদি নাকি বেনারসের গোধুলিয়ার কাছে এক গলির মধ্যে। আপৎকালীন কথা ভেবে ও আসার সময় ঠিকানা জোগাড় করে নিয়ে গেছে, যা আমি তখনই মাত্র জানতে পারলাম। খুঁজে খুঁজে দুই তরুনে হাজিরও হলাম দশাশ্বমেধ রোডের গলি ও তস্য গলির মধ্যে সেই দিদির বাড়ি। মন্টুর দূর সম্পর্কের দিদি ওকে চিনতেই পারছিলো না। মন্টুও ছাড়বার পাত্র নয়। নানা প্রক্রিয়ায়, পরের পর নানা সুত্র দিয়ে প্রায় এক ঘন্টা ধরে চেষ্টা চলল। যখন প্রায় হাল ছেড়ে দেবার অবস্থা তখন কোন এক চেনা নামের সূত্রে ক্ষীণ আশা তৈরী হল। বলা যায় শেষ পর্যন্ত  মন্টু একপ্রকার চেনাতে বাধ্য করেছিল। যাক বাবা, আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেল। পরের দিন-ই ছিল পরীক্ষা। সে পরীক্ষা পর্ব শেষ করেই সকাল বিকাল শুরু হল আমাদের বেনারস অভিযান।

বরুণা আর অসি নদীর মাঝে এই স্থান, তাই নাম বারানসী, যা বিভ্রাটে বেনারস হয়ে গেছে। তবে এসব তথ্য তখন অজ্ঞাতই। তখন দুচোখ ভরে দেখছি আর পুরোপুরি উপভোগ করছি – যতটা পারা যায় বেনারসের রস আস্বাদন করা যায়। গোধুলিয়া মোড়, দশাশ্বমেধ রোড, এই গলি ওই গলি হয়ে কোন একটা ঘাট, টাঙা – সব মিলিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজ যাকে বলে।

বিশ্বনাথ মন্দিরে যাবার রাস্তায়, আগে ডানদিকে পড়ে কালা পাহাড়ের মন্দির/মসজিদ, যেটা ডানদিকে হেলানো। লোকশ্রুতি আছে, মন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর, কালাপাহাড় বলে ছিল “মা তোমার ঋন শোধ করলাম”, আর তারপরই নাকি মন্দিরটা ডানদিকে হেলে যায়। বিশ্বনাথ-গলির মুখেই ছিল পেঁড়ার দোকান। আর গলির মধ্যে ছিলো অনেক পান, জর্দা, কাঁচের চুড়ি, আর বেনারসি কাপড়ের পাড় বিক্রির দোকান। অনেক দোকানের নাম আবার বাংলায় লেখা। তারা বাংলাতেই ডাকাডাকি করছে। পুজোর সামগ্রী আর কাঠের খেলনার দোকান। পাত্রে রাখা জলে ভটভটিয়ে চলছে স্টীমার। গলিতে সব সময় ভিড় লেগেই রয়েছে। ওই গলি ধরে এপাশ ওপাশ করে পৌঁছে যাওয়া যায় মনিকর্ণিকা ঘাট আর কাল ভৈরব মন্দির। মন্দিরের সামনে কালো কার দিয়ে ডিজাইন করা এক বিশেষ ধরনের মালা বিক্রি হতো, যা আমার গলায়ও বহুদিন ছিল।

বেনারসের গঙ্গার পাড়ের ও নিকট এলাকার বেশির ভাগ বাড়িই ছিল পাথরের তৈরি। আর অলিতে-গলিতে দেখা যেতো পথ আটকে দাঁড়ানো বা বসা নিরীহ ষাঁড়। কোনোটা আপন মনে বসে, আবার কোনোটা বা দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে। নিজেকেই পাশ দিয়ে পথ করে যেতে হয়। আর পথে ঘাটে ছিল বিদেশী পর্যটকের মেলা। তারা গঙ্গায় সকাল-বিকাল নৌকা বিহার করতো। আর আমরা দুপুরের কাঠফাটা রৌদ্রে নৌকা চাপতাম। তাতে করে খানিক সস্তা হত। তখন স্থানীয় ছেলেরা দেখতাম নৌকা থেকে মাঝ গঙ্গায় ঝাঁপ দিচ্ছে। আমরাও গঙ্গা স্নান রুটিন করে ফেলেছিলাম। গঙ্গার অপর পাড়ে রামনগর গিয়েছিলাম নদী পথেই। রামনগর দূর্গ আর তার অস্ত্রশস্ত্রের সম্ভার সহ সমৃদ্ধ মিউজিয়াম এখনো মনে লেগে আছে।

সন্ধ্যার মুখে ঘাট গুলোর অন্য রূপ। কোথাও কথকতা, কোন মন্দিরের আরতি আর ঘন্টাধ্বনি, বাচ্ছা ছেলের মুখে ভ্যাঁ-পো, গঙ্গায় প্রদীপ ভাসানো, অলস ভাবে গঙ্গার দিকে চেয়ে বসে থাকা পর্যটক পরিবার – সাউন্ড সিস্টেমে গান চালিয়ে গঙ্গা আরতির কৃত্রিমতা প্রবেশ করেনি তখনো। বেনারসের সমস্ত ঘাটই বারে বারে  হেঁটে  বা নৌকায়  প্রায় প্রতিদিনই ঘুরতা্ম। সবচেয়ে খারাপ লাগতো রাজা হরিশচন্দ্রের ঘাট। অবিরাম চিতা জ্বলছে। ওখানে দাহ করার আগে মৃতদেহ গঙ্গার জলে অনেকক্ষণ ডুবিয়ে রাখতো, আর একজন বড়ো লাঠি নিয়ে ছবিতে দেখা রাজা হরিশচন্দ্রের মতো করে দাঁড়িয়ে লাশটাকে পাহাড়া দিত। এটাই ছিল বিশেষত্ব। 

বেনারসের রাস্তা ছিল বেশ ঘিঞ্জি। বাহন বলতে সাইকেল রিক্সা আর ঘোড়ার গাড়ি বা টাঙা। গোধুলিয়ার মোড়ে  ট্রাফিক পুলিশের মাথায় লাল রঙের অদ্ভুত সুন্দর অলঙ্কৃত পাগড়ী, আর তার হাতে থাকতো লালের উপর সাদা দিয়ে স্টপ লেখা গোলাকার চাকতি। আর এমন ভাবে হাত নাড়াত, তাতে মনে হত ক্যারাটে প্রদর্শন চলছে। আর সেখানেই চিত্তির। চার রাস্তা দিয়ে এতক্ষণ ঠিকঠাক আসা যানবাহন এই গোধুলিয়ার মোড়ে এসেই জট পাকিয়ে যেত। সত্যি কথা বলতে কি এত রিক্সা আর টাঙ্গা চলতো যে, তা নিয়ন্ত্রণ করাই মুশকিল ছিল।

গোধুলিয়ার কাছাকাছিই ছিল বাঙালির হরসুন্দরী ধর্মশালা। এরকম বেশ কিছু ধর্মশালা চোখে পড়েছিল। সে সবের নাম বিশেষ মনে নেই। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি যাবার পথে ছিল বাঙালিটোলা। গোটা বেনারস জুড়েই তখন বাংলায় কথা বলা যেত, অনেক দোকানের সাইন বোর্ডে ছিল বাংলা হরফ, আর বেশির ভাগ অবাঙালিরাও বাংলায় কথা বলতে পারতো। দূর্গা মন্দির,  সংকটমোচন মন্দির, বিড়লা মন্দির ছাড়াও অনেক দ্রষ্টব্য আমরা টাঙ্গায় চেপে ঘুরেছি। সঙ্কট মোচন  মন্দিরের সামনের পেঁড়ার দোকানের পেঁড়ার স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। আজকের মত এত অটো-রিক্সার চল তখন ছিল না, বা থাকলেও আমরা সারনাথ গিয়েছিলাম ওই টাঙ্গা করেই। ছোটবেলায় গরুর গাড়ি চাপার অভিজ্ঞতা নিয়ে সেই প্রথম আমার ঘোড়ার গাড়ি চাপা। টাঙ্গাগুলোয় তখন রঙের পোঁচ পড়ত। আর কালো, সাদা, বাদামী বা মিশেলি ঘোড়াগুলো রঙবেরঙের এর সুতোর মালা দিয়ে সাজানো থাকতো। ঘাড় আর মাথার কেশর ছাঁটা থাকত – একেবারে চাইনিজ কাট বলতে যা বোঝায় আর কি – একদম ঝক্কাস। প্রত্যেক ঘোড়ার আবার সুন্দর নামও বরাদ্দ ছিল। ঘোড়াগুলো যখন সওয়ারী নামিয়ে বিশ্রাম নিত, তখন গাড়ি থেকে আলাদা করে দিত আর মুখের সামনে  ঘাসের একটা ছোট ব্যাগ ঘাড় থেকে ঝুলিয়ে দিত।

বেনারস থাকাকালীন আমরা সারনাথ, রামনগড়, চুনার ফোর্ট, মির্জাপুর, বিন্ধ্যাচল প্রায় সব বিশেষ দ্রষ্টব্যই ঘুরে নিয়েছিলাম। একদিন এলাহাবাদ গেলাম চাপা ভ্যানে করে। তখন এলাহাবাদ ছিল সুন্দর সাজান শহর, অনেকটা নিউ দিল্লির মতো। যাই হোক, একসপ্তাহ ধরে বেনারস ভ্রমণ পর্ব চলল। এবার যাবার সময় এল। মন্টুর দূর সম্পর্কের দিদির দুইটি বাচ্চা মেয়ে ছিল। একটু  চক্ষু লজ্জা হওয়ায়, পকেটের মায়া না করে, বেনারস ছাড়ার আগে আমরা বাবা বিশ্বনাথের গলি থেকে ছয় টাকা ডজন দরে দুই মেয়ের জন্য কাঁচের চুড়ি কিনে আনলাম।

(২)

পকেটে এখনো কিছু বেঁচে। এবার আমাদের এজেন্ডা ‘চল দিল্লি’। এবং অবশ্যই বিনা টিকেটে। সবাইকে বিদায় জানিয়ে সেই মুঘলসরাই স্টেশন এলাম। লক্ষ্য তুফান এক্সপ্রেস। প্ল্যাটফর্মে থিক থিক করছে ভিড়। দুর্গা পুজোর আগে স্বাভাবিকভাবেই ট্রেনেও প্রচুর ভিড়। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে ওঠার অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। এর মধ্যেই ট্রেন চলতে শুরু করেছে। মন্টু দেখলাম ওর ওই বড় ট্রাঙ্ক মাথায় নিয়ে একটা মিলিটারি কম্পার্টমেন্টের ভিতর ঝাঁপিয়ে পড়লো। দেখাদেখি আমিও। এবার মিলিটারিদের সঙ্গে যুদ্ধ। তারা আমাদের নামিয়ে দেবেই। আর আমরা হিন্দি, বাংলা, ইংরাজি মিশিয়ে তাদের রাজি করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।  তারপর কি হলো – মনে হয় আমাদের হিন্দি শুনেই বা ওরা একসময় রাজি হয়ে গেল।

পরের দিন সকালে পৌঁছালাম ওল্ড দিল্লি স্টেশনে। ভাগ্য সঙ্গে চলেছে। এখানেও টিকিট চেক করার বালাই নেই। আমাদের হাতে তখন অনেক টাকা। এখানেও একটা টাঙ্গা করে রওনা দিলাম দিল্লি কালীবাড়ির দিকে। দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেছে। এখানে ঘর থাকলেও জায়গা হল না সঙ্গে পরিবার না থাকার জন্য। স্থান হল বারান্দায়। পাশেই বিড়লা মন্দির। ওখানে গিয়ে একদিন আবিষ্কার করলাম অল্প পয়সায় নিরামিশ সুস্বাদু খাবার, আর শেষ পাতে পায়েস। সুতরাং খাবার জায়গা ফিক্সড হয়ে গেল। আমরা যত দিন দিল্লী ছিলাম ততদিন দিনের বেলায় তড়িঘড়ি বিড়লা মন্দিরের কাউন্টারে লাইন দিয়ে খাবারের কুপন কাটতাম আর রাতে বিড়লা মন্দিরের বারান্দায় শুয়ে থাকতাম,  কারণ এই জায়গাটা দিল্লি কালীবাড়ীর চেয়ে অনেক অনেক গুন ভালো ও নিরাপদ। এরজন্য অবশ্য আমাদের বিড়লা মন্দিরের বয়স্ক, নাদুস-নুদুস চেহারার দারোয়ান ভদ্রলোকের সঙ্গে স্ব-হিন্দিতে ভাব জমাতে হয়েছিল। এদিকে আবার সকাল বিকাল ফ্রেশ হবার জন্য কালীবাড়িই ছিল ভরসা। যাই হোক, থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্ত হতে, পুরানা আর নয়া দিল্লি সাইকেল রিক্সা, এক্কা গাড়ী, বাস, মোটর সাইকেল লাগানো অটো – যখন যা পেয়েছি তাতেই আমরা চষে ফেললাম। পয়সার জন্য কোনো কার্পণ্য করিনি। এক সন্ধ্যায় প্রগতি ময়দানে হাজির হলাম। তখন রাবন বধ পর্ব অর্থাৎ দশেরার অনুষ্ঠান চলছে। মনে আছে মুখ বদলাতে দুই-একদিন  ডিনার করেছিলাম জামা মসজিদের পাশে।

এবার একদিন দিল্লির কাশ্মীরি গেট থেকে বাসে করে আমরা মথুরা হানা দিলাম। তারপর হাইওয়ে থেকে টাঙ্গা করে সোজা কংসের কারাগারে। পাশেই জৈনদের ধর্মশালা। ওখানে ঘর ভাড়া মানে চারপাই অর্থাৎ খাটিয়া ভাড়া করে ছিলাম। দুটো চারপাই ছয় টাকার বিনিময়ে। তারপর হেঁটে হেঁটেই বিশ্রাম ঘাট। যমুনায় তখন স্বচ্ছ নীল জল আর ঘাটে অনেক কচ্ছপ। মথুরার বেশিরভাগ বাড়ীই ছিল কাস্ট আয়রনের ডেকরেটেড পিলার দিয়ে তৈরী, অনেকটা হাওড়ার ভীমসেন হোটেলের মতো। কংসের কারাগার যেখানে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বলে কথিত সেটি লম্বায় দশ-বারো ফুট আর চওড়ায় পাঁচ-ছয় ফুট হবে মনে হয়। জন্ম স্থানটা মাটি থেকে বেশ খানিকটা নীচের দিকে- প্রায়  ফুট ছয়েক। কারাগারের সামনের রাস্তাটা যেটা বিশ্রাম ঘাটের দিকে গেছে সেটা অনেকটা বাংলার “দ” এর মতো।  কোণে একটা মসজিদ ছিল। ঘাট পর্য্যন্ত  কিছু দোকান, হোটেল নিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। আমরা নৈশশাহার সেরেছিলাম সেরকমই একটা হোটেলে।

পরের দিন আবার ওখান থেকে টাঙ্গায় বৃন্দাবন। বেশ একটা শান্তির জায়গা – সব্বাই বাংলায় কথা বলে। আর রাস্তার ধারে ধারে দুধ, রাবড়ি আর পেঁড়ার দোকান। হোটেলে  নিরামিষ আহার। বিউলির ডাল, আলু ভাজা , আলু পোস্ত , চাটনি সবই রয়েছে খুবই সস্তায়। বৃন্দাবনের রামকৃষ্ণ মিশনটি ছিলো ন্যারোগেজ রেল স্টেশনের পাশেই। সুতরাং আমাদের ঠিকানা আবার বারান্দায়। ঠিক মনে আছে, এক মাঝ বয়সী ভদ্রলোক আশ্রমের সবাইকে নিয়ে দুপুরের পর হেঁটে হেঁটে মন্দির দর্শন করাতে বেড়োতেন। আমরা ঠিক করেছিলাম এই বাবদ কোনো খরচা নয়। তাই তাঁকে ‘মহারাজ’ বলে সম্বোধন আরম্ভ করলাম। দুইদিন ঘোরানোর পর শেষে তিনি রেগে উঠে বললেন –“আহ, আমি ম-হা-রা-জ নই”। যাই হোক, দুইদিন ঘোরানোর পড় আমরা এক টাকা করে দুইজন প্রণামী দিলাম। পরে আবার আফসোসও করেছি, না দিলেই ভালো হতো।

দিল্লী, মথুরা, বৃন্দাবন হল, তবে আগ্রাই বা বাকি থাকে কেন। অতএব এবারের গন্তব্য বৃন্দাবন থেকে ন্যারোগেজ ট্রেনে আগ্রা, এবং যথাপুর্বক অবশ্যই বিনা টিকিটে। অনেকটা রাত্রে ট্রেন ছিল। যখন ছাড়ার কথা, তারও ঘন্টা খানিক দেরি করে  ট্রেনটা প্লাটফর্মে দিয়েছিল আর ছাড়তে ছাড়তে প্রায় রাত একটার কাছাকাছি। আগ্রা পৌঁছালাম ভোরবেলা। আগ্রার তাজমহল দর্শনে তখন পয়সা লাগতো না। শুক্র বার বন্ধ থাকতো। আমরা লক্ষী পুজোর দিন রাত আটটা পর্য্যন্ত তাজমহলে থেকে রাতে শুতে গেলাম আগ্রা প্ল্যাটফর্মে। আনন্দবাজার কাগজ বিছিয়ে সটান। হ্যাঁ, আমরা প্রায় প্রতিদিনই একটা করে বাংলা কাগজ কিনতাম – পড়া আর তার পর বিছিয়ে শোবার জন্য। পাছে আমাদের ট্রাঙ্ক চুরি হয়ে যায়, তাই মন্টু কিছুক্ষণ আর আমি কিছুক্ষণ পাহারায় থাকতাম। সকালে যখন ঘুম ভাঙতো, তখন  দেখতাম দুইজনই এক সঙ্গে ঘুম থেকে উঠছি।

আগ্রা থেকে ন্যারোগেজের ট্রেনে  বিনা টিকেটে যাতায়াত  ফতেপুর সিক্রি। ফতেপুর সিক্রি ঘোরার সময় যেখানেই দেখলাম কোন পর্যটক দল গাইড নিয়ে এগোচ্ছে সেখানেই আমরা এঁটুলীর মতো লেগে গেলাম, কারণ ইতিহাসটাও জানা দরকার। আমাদের কমার্স আর সায়েন্স বিদ্যা, কাজেই ইতিহাস শিক্ষাটা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ – তাও সাজেশন করে পাশমার্ক পাবার জন্যই পড়া। ফলে ইতিহাসে ভীষণ পন্ডিত দুই জনেই। সে বিচারে অবশ্য সব বিষয়েই পন্ডিত ছিলাম আমরা।

একদিন দেখলাম পুঁজিতে টান পড়েছে। এবার ফিরতে হবে। ফেরার সময় আর অনৈতিক কাজটি না করে আসানসোল পর্যন্ত ষাট টাকা দিয়ে তুফান এক্সপ্রেসে টিকিট কাটলাম। তখনো দুই দিনের খরচ বাবদ হাতে ছিল ষোলো টাকা। এভাবেই সাঙ্গ হল সেই ভ্রমণ পর্ব।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেই পরীক্ষা পাশ করে ব্যাঙ্ক অফ বড়োদা, গোধুলিয়া শাখায় পোস্টিং-ও হয়েছিল, কিন্তু জয়েন করা হয় নি, কারণ ততদিনে ন্যাশানাল লাইব্রেরী আর কলকাতায় অন্ধ্র ব্যাঙ্কের চাকরি নিশ্চিত হয়ে গেছে। তারপর চৌত্রিশ বছর ধরে অনেক হল ঘোরাঘুরি। মাঝের যাত্রাটুকু বেশ আরামেই বলা যায়। কিন্তু তারুণ্যের সেই পকেটে রেস্ত না থাকার দিনে কিঞ্চিত নৈতিকতা বিগর্হিত সেই ভ্রমণ যে আনন্দ দিয়েছে, তা আজও অমলিন।

প্রতিবেদনে ব্যবহৃত সব ছবির সৌজন্যঃ লেখক অপূর্ব মিত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *