২০২১ নির্বাচন – একটি বিশ্লেষণ

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার একটা ধারণা হচ্ছে। কী হবে ‘২১ এ এটা ঠিক এখনই বলা যাচ্ছে না বা, বোঝা যাচ্ছে না। তবে কেন জানিনা মনে হচ্ছে, বিজেপি (BJP) খুব অফেন্সিভ খেলছে। আসলে বিজেপি ডিফেন্স এ খুব দুর্বল । আমার ধারণা দলগতভাবে বিজেপি যতই হাঁকডাক আর মিডিয়া ক্যাচার হোক না কেন , সাধারণ মানুষের কাছে বিজেপি এখনো খুব একটা গ্রহনীয় হতে পারছে না। সেক্ষেত্রে সিপিআইএম(এল) (CPI ML) লিবারেশন পার্টির দীপঙ্কর ভট্টাচার্য র কথা অনুসারে বামপন্থা নিয়ে বিজেপি বিরোধীতা খুবই পরিষ্কার বা প্রাসঙ্গিক বা সময়োচিত হলেও বাংলায় এখানে কিন্তু নির্বাচনে “বাম” বোঝাতে এখনও সিপিআই(এম) (CPI M) কেই বোঝায়। সিপিআই(এম) পশ্চিমবঙ্গে এতদিন করছিল মূলত মমতা বিরোধীতা, সাথে পৃষ্ঠার নীচে ছোট্ট করে একটা ফুটনোটে বিজেপি বিরোধীতা “ওঁ নমো” করে ছিল। বোঝাই যায় তারা জানত যে তাদেরই নীচুতলার একটা ভাল অংশ বিজেপির সঙ্গে লেগে গেছে ইতিমধ্যেই। বলতে গেলে বিজেপি ওয়েভ তৈরী হয়েছে সিপি আই(এম) এরই ভোটের বেশ বড়ো অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে। অন্যভাবে বলতে গেলে মমতাকে ঢিট করতে গিয়ে নিজের ডাল নিজেই কেটেছে সিপিআই(এম)। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সিপিআই(এম) এর। নীচুতলার বামকর্মীরা ও সমর্থকরা পার্টি-নেতৃত্বের কাছে বিপদের দিনে কোন শেল্টার পায়নি – আমার সিপিএম বন্ধুদের যতোই খারাপ লাগুক এটা কিন্তু সত্যি কথা। ওঁৎ পেতে বসেছিল বিজেপি। অসহায় নীচুতলার পার্টির কর্মী ও সমর্থকরা আশ্রয় পেলো বিজেপির খেলাতে । ভয়ঙ্কর ভাবে সিপিএম এর ভোট ভাঙল – এটা তারই প্রমাণ।

কিন্তু ইদানিং সিপিআই(এম) যে স্ট্রাটেজিটা নিয়েছে সেট বেশ ভাল চাল। দেখুন , ভোট রাজনীতি মানেই একটা খেলা , গরম গরম খেলা। এবং অভদ্র লোকের খেলা। ভদ্রতার লেশমাত্র আর নেই। এটা সবাই জানেন যে নৈতিকতা এখানে কমই, সে যেকোন রাজনৈতিক দলই বা যেকোন কুশীলবই হোন না কেন। যাইহোক,যেটা বলছিলাম , সেটা হলো ইদানিং সিপিএম আরো জোরালো ভাবে বলছে যে তৃণমূল যদি বাপের বাড়ি হয় , বিজেপি তবে শ্বশুরবাড়ি। এটা আগেও সিপিএম বলতো , কিন্তু সেটা তারা মানুষকে বিশ্বাস করাতে পারত না। কিন্তু ইদানিং তৃণমূল থেকে বিজেপি ও বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসা যাওয়ার এই অনায়াস খেলায় সিপিএম এর আগের ধারণাটি এবার জনগণকে বিভ্রান্ত আর করবে না , অনেকেই এটা “সত্যি” ভাববে। যদিও আমি মনে করিনা যে তৃণমূল বা বিজেপি অভিন্ন ও আঁতাত আছে দুটি দল-এ। সেটা থাকলেও কারুর কারুর সাথে থাকতে পারে , দলগত ভাবে মোটেই নয়। এ তর্ক বৃথা , তাহলে তো যেভাবে সিপিএম এর ভোট বিজেপি টেনেছে , সেটাও কি তাহলে আঁতাত? মোটেই নয়। একটা কথা মনে রাখতেই হবে “লাভ জিহাদ” (Love Jihad) বা “এন আর সি“(NRC) বা “এন পি আর” (NPR) এর মতো কালা আইন বিজেপি ছাড়া আর কেউ বা কোন দল আনার সাহস করবে না। ৩৭০(Article 370) রদ করা – কোন দলের পক্ষেই সম্ভব নয় , বিজেপি ছাড়া। বিজেপি তাই ভয়ঙ্কর। ভয়ঙ্কর।

কিন্তু সিপিএম কদিন হল তার স্ট্রাটেজি চেঞ্জ করেছে। এছাড়া সিপিএম এর আর কোন রাস্তা ছিলো না। দীপঙ্করের পথ সিপিএম নিতে পারবে না। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম এর বাস্তবতা অন্যরকম। জেলায় জেলায় প্রচুর সিপিএম কর্মী ফলস্ কেস খেয়েছে। অকারণে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তৃণমূল দম্ভে বিরোধী শূন্য (এ দম্ভ সিপিএম এরও ছিলো যখন ক্ষমতায় তারা ছিল ; যেমন “আমরা ২৩০ , ওরা ৩০” – বুদ্ধ উবাচ)
করতে চেয়েছিলো বলেই শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচন কেমন হয়েছিল সকলেই জানেন। ঘরছাড়া হয়েছিল প্রচুর সিপিআই(এম) কর্মী ও সমর্থক। অবশ্যই নীচুতলার। কেউ তাদের শেল্টার দেয়নি। কাজেকাজেই কীভাবে বাস্তবতা তাদের আনবে প্রধানত বিজেপি বিরোধীতা? কিভাবে? মানুষ মোদি কে আগে দেখবে নাকি নিজের পাড়া, নিজের বাড়িতে থাকার অস্তিত্ব ও প্রতিদিনকার দাদাবাজি তোলাবাজির দৌরাত্ম্য সমাধান করার জন্য একটা বিহিত চাইবে? “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” বললে আরো ক্যালাবে – তার থেকে “জয়শ্রী রাম” বললে তৃণমূল ভয় পাবে। তৃণমূলের ভয় পাবার একটা বড়ো কারণ হল তৃণমূল নিজের কর্মীদেরই বিশ্বাস করে না। যাইহোক, তাই,সিপিআই(এম) এর স্ট্যান্ড – এটা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কাজেই তাদের নতুন এই স্ট্রাটেজিটা আপাতত বেশ মনে হচ্ছে।
আচ্ছা , analogy তে এটা ধরলাম , মমতা কে হটাও, তাহলে ঘুরিয়ে কি বলা যায় না যে বিজেপি কে বাঁচাও?
নির্বাচন হয় বাইনারি সিলেকশনে। কেমন ? তাই জন্যই বিজেপি ৩৭% ভোট পেয়ে কেন্দ্রে এসেছে। পড়ে থাকলো ৬৩% ভোটার বাইরে যারা বিজেপি কে সমর্থন করে না। বাইনারিতেই তাই বিজেপি এসেছে।

দ্বিতীয়তঃ , এখানে বিজেপি আসা মানেই এন আর সি লাগু করা। তাদের রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইলেকশন অবধি তারা সংবিধান মানে। ইলেকশন জিতে তারা সংবিধানকে ভাঙার চেষ্টা করে একটার পর একটা সংবিধান বিরোধী কালা আইন সংসদে কোনরকম আলোচনা ছাড়াই দ্রুত পাশ করিয়ে নেয়।

তৃতীয়তঃ , বর্তমানকে বিচার না করেই সিপিএম ধাপতত্ত্ব বিচার করে। মানে , ২১ এ বিজেপি , ২৬ এ বামফ্রন্ট। এই ধাপতত্ত্ব চিন্তা করা মারাত্মক।
তাই যদি হত , ত্রিপুরায় মমতা কোথায় ? ওখানে এখন সিপিএম এর অস্তিত্বই রাখতে দিচ্ছে না বিজেপি। মুছে ফেলতে চায় সিপিএম কে। বিজেপি এখানে এলে আগে নকশাল কেন , সিপিএম কেই বধ করবে , মমতারও আগে।

চতুর্থতঃ , আমার লেখায় কি আমি এটা বুঝিয়েছি যে আমি সিপিআই(এম) এর থেকে মমতার প্রতি দুর্বল? তাহলে আর একবার পড়ো। আমি কোন পক্ষ নিয়ে কথা বলি নি। এমনকি নকশালদেরও পক্ষেও বলিনি। ইলেকশন স্ট্রাটেজিতে লিবারেশন ভাল ফল খেলেছে কিন্তু বিহারের জয় ওদেরকে এখানে একটা বিকল্প দেখার স্বপ্ন দিচ্ছে। তাই সিপিআই(এম) কে দিয়েই ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। আমি সেটাই বলেছি। বা , বুঝিয়েছি। কোনদিনই এখানে বিজেপিকে হটাতে সিপিআই(এম) মমতার সাথে গাঁটছড়া বাঁধবে না , কারণ মমতা তৈরীই হয়েছে সিপিএম বিরোধীতা করে , লিবারেশন বিরোধীতা করে নয়। নোমেনক্লেচার টা একেবারেই সিপিএম ও মমতা বৈরী সুলভ। কোনদিন তেলে জলে মিশ খাবে না। সিপিএম এর বাস্তবতাই অন্যরকম। এই বাস্তবতাকে সিপিএম এর বর্তমান যে স্ট্রাটেজি সেটা এখন মানুষ বিশ্বাসযোগ্য মনে করতেও পারে যে তৃণমূল ও বিজেপি যথাক্রমে বাপের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি।

পঞ্চমতঃ, সিপিএম কোনদিনই সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের ভুল স্বীকার করেনি। পার্টি বহির্ভূত কিছু কাজ কিছু নেতা করে দলকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে (এক), মিডিয়া হাইজ্যাক করে মানুষকে ক্রমাগত বিভ্রান্ত করেছে (দুই) এবং অভদ্রতা করে ভদ্রতাকে হারানোর পাল্টা প্রকাশ করতে পারেনি ভদ্র সিপিএম (তিন)। তাই চলে গেছে বামেরা —-
এই উপরিউক্ত তিনটি কারণ সিপিএম দর্শায়। কিন্তু এটা ভুলে যায় তারা সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের সিদ্ধান্ত তাদের ভুল ছিল। মমতা পরবর্তী কালে সিঙ্গুর নিয়ে প্রচুর ভুলভাল স্ববিরোধী কাজ করেছে। তারজন্য সিঙ্গুরের মানুষেরা এবং নন্দীগ্রামের মানুষেরা তিতিবিরক্ত। কিন্তু এটা মানে এটা নয় যে সিপিএম এর সেই বিষয়ে কাজগুলি সব ঠিক ছিল। এ ভুল মানে ও ঠিক – এরকম রেসিপ্রোকাল কিন্তু নয় ব্যাপারটা।
বলি , ব্রান্ড বুদ্ধের ইমেজ কোন মিডিয়ার দেওয়া? গণশক্তির তো নয় ! তখন মিডিয়া ভাল ছিল?

ষষ্ঠতঃ, ১১ সালের পরবর্তী ইলেকশন গুলোর প্রতিটি পার্টির ভোটিং পার্সেন্টেজ নিয়ে কথা বলো , দেখবে যে ভোটার ইরোশন হয়ে ভোটগুলো কোনদিকে গেছে।

যাইহোক , বিতর্ক চলুক, সুস্থভাবে বিতর্ক চাই। বিতর্ক ছাড়া কোনকিছুই এগোতে পারে না। তাবলে একে ওকে ধরে বোর করা নয় বা খেউড় করা নয়।

এখন দেখা যাক – আরো তিন বা চার মাস পরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আরো ভাল বোঝা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *