বাজে করুণ সুরে – চতুর্থ পর্ব

শিবাজি চক্রবর্তী

তৃতীয় পর্ব থেকে চতুর্থ পর্বে পৌঁছতে একটু সময় লেগে গেল। ব্যক্তিগত নানা সমস্যায় লেখাটা তৈরি হয়েও পোস্ট করা হয়নি। সমর চক্রবর্তী সার্ভিসেস থেকে বাংলায় ফিরে আসছেন। এমনই এক আবহে আগের পর্বে দাঁড়ি টেনেছিলাম। এবার নতুন অধ্যায়। অনেক অজানা গল্প। কিছু ক্রিকেটের। কিছু ক্রিকেটের বাইরেও বটে। ব্যক্তি সমর চক্রবর্তী বা চাকুদা কে জানতে গেলে, চিনতে গেলে এগুলো লেখা প্রয়োজন। কেমন লাগছে পড়ে জানাবেন। উৎসাহিত হব।

“ইডেনে মহারাষ্ট্র কে নুইয়ে দিয়েছে বাংলা।” খবরের কাগজের মোটা অক্ষরের হেড লাইন টা কাঁচি দিয়ে কেটে গঁদের আঠা দিয়ে যত্ন করে নিজের খাতায় আটকে দিলেন ছোটো কাকা। মেজো কাকার হাতে আরো কয়েকটা ইংরিজি, বাংলা কাগজ। সব কটার খেলার পাতা জুড়ে সমরের কৃতিত্ব আর বাংলার জয়জয়কার। এত বছর পরে পাতা গুলো শীতের বিকেলের মতো বিবর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু অক্ষরগুলোর দিকে তাকালে টাইম মেশিনে চড়ে পিছিয়ে যেতে ইচ্ছা করে দিনগুলোতে।

কি করে ভোলা যায় সেই মার্চের কথা! ১৯৭১-৭২ এর রঞ্জি মরসুম চলছে। ইডেনে কোয়ার্টার ফাইনাল। মহারাষ্ট্রকে ঘায়েল করল বাংলা। চেতন চৌহান, মধু গুপ্তে, চান্দু বোরদে আর সালধানার উইকেট সমরের পকেটে। অবিশ্বাস্য বোলিং স্পেল। ১৬ রানে চার উইকেট। এই স্পেলটার কথা আমাকে বলেছেন অনেক প্রবীণ। যাঁরা সেদিন ইডেনে ছিলেন। আর বাবার ছিল একটা অভিমান। যদি চুনিদা সরিয়ে না নিতো আরো তাড়াতাড়ি শেষ করে দিতে পারতাম। আসলে চুনিদা কে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। তাই মুখে একবারও প্রকাশ পায়নি।

সেমিফাইনালে এপ্রিলের গরম টা হায়দ্রাবাদকে আরো ভালো ভাবে টের পাইয়ে দিয়েছিল চুনী গোস্বামীর বাংলা। রঞ্জি সেমি ফাইনাল। ইডেন তখনো কংক্রিটের খাঁচা হয়নি। বাবুঘাটের দিক থেকে বয়ে আসতো গঙ্গার হাওয়া। সেই হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে কি ভাবে লাল টুকটুকে বলটা দিয়ে বিপ্লব ঘটানো যায় সেটা সমর চক্রবর্তী- সুব্রত গুহ জুটি ভালোভাবেই জানতেন। বাংলার মাটি কেন। গোটা ভারতেই ত্রাস চাকুদা-বাচ্চুদা। বাংলা ক্রিকেটে এই পেস জুটি ই কি সবার সেরা? বিচারের ভার রইলো পাঠকের ওপর।

ম্যাচ টা বাংলা জিতল। প্রথম ইনিংসে হায়দ্রাবাদকে ১৮৩ তে মুড়িয়ে দিলেন বোলাররা। ১৮ ওভার বল করে ৩১ রানের বিনিময়ে সমরের সংগ্রহে দুটো উইকেট। আব্বাস আলী বেগ আর জয়ন্তীলাল।

দিলীপ দোশী পেলেন পাঁচ উইকেট। এবার বাংলার পালা। ইডেনে স্ট্রোকের ফুলঝুরি জ্বালিয়ে সেঞ্চুরি করলেন অম্বর রায়। বাংলা ২৯০। দ্বিতীয় ইনিংসে সমর যেন চৈত্রের কাল বৈশাখী।

৩১ ওভার। ১২ টা মেডেন। ৫৬ রানে চার উইকেট। আব্বাস আলী বেগ, জয়ন্তীলাল, আব্দুল হাই আর মমতাজ হোসেনকে সাজঘরে ফেরালেন। এপ্রিল মাসের দাবদাহে একজন পেসার ৩১ ওভার বল করছেন। খরচ করছেন ৫৬ রান। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়েছে প্রতিটা ডেলিভারি অপ্রিয় প্রশ্ন হয়ে আছড়ে পড়ছে নবাব পতৌদির হায়দরাবাদের দুর্গে। এর পরেও আমি বাদ নবাব? কেন? কেন? এই “কেন” এর উত্তর বাবা শেষ জীবনেও খুঁজেছেন বারবার।

কিন্তু “কেন” এর উত্তর তো খোঁজার কথা ছিল না। শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলা জওয়ান কোনোদিন মাঠের বাইরের খেলাটা বুঝতে পারলো না। এই কথাটাই আমাকে বলেছিলেন গোপাল বসু। পেশার খাতিরে গোপাল দার ফ্ল্যাটে গিয়েছি বহুবার। অনেক পরে গোপাল দা জেনেছিলেন আমার বাবা সমর চক্রবর্তী। গোপাল দা বারবার বলতেন নির্লজ্জ লবিবাজির নানান কথা। বাদ পড়ার গল্পে দুজনেই তো একই নৌকোর যাত্রী।

“চাকু তোমার বাবা?” ইন্টারভিউয়ের পর আমার দিকে তাকিয়ে অন্তত দশ সেকেন্ড চুপ করে ছিলেন অজিত ওয়াদেকার। সচিন টেন্ডুলকার অবসর নিচ্ছেন। মুম্বাই গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার তীর্থক্ষেত্র। এক দুপুরে হাজির হয়ে গেছিলাম অরিলি সি ফেসের এপার্টমেন্টে। সাজানো ফ্ল্যাট। বাইরে ব্যালকনি থেকে দেখা যাচ্ছে সমুদ্র। লোনা ঢেউ আছড়ে পড়ছে বোল্ডারে। মিনিট কুড়ি ইন্টারভিউয়ের পর প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক জানতে চাইলেন বাংলা ক্রিকেটের কথা। তখনই বাবার কথা উঠলো। ওয়াদেকার বলেছিলেন এখুনি ফোনে ধরাও। চাকুর সঙ্গে কথা বলবো আমি।

মার্জিত, ভদ্র ওয়াদেকার কথা শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিলেন। ছোট্ট একটা শব্দ “ব্যাড লাক চাকু।”

দিল্লি তে ফিরোজ শা কোটলায় দাঁড়িয়ে একই কথা শুনেছি চান্দু বোরদের মুখে ” চাকুকে না নেওয়াটা অন্যায়।” বোরদেকেও তো বারংবার প্যাভিলিয়নের রাস্তা দেখিয়েছেন সমর।

আরও কয়েকটা ঘটনার কথা মনে পড়ল। মোহালি তে ভারত বনাম ইংল্যান্ড টেস্ট কভার করছি। পিচ কিউরেটর দলজিত সিংহ। দেখি মাইক গ্যাটিং ঢুকছেন। ছোট্ট ইন্টারভিউ শেষ হতে না হতেই দলজিত এলেন। পিচ কেমন জানতে চাইলেই বেশ ভালো বাংলায় উত্তর দিলেন। আমি তো বেশ অবাক। দলজিত বুঝে বললেন আমি অনেকদিন খেলেছি ইস্ট জোনের হয়ে। দলজিত জিগ্যেস করলেন বাংলার কথা। বাবার কথা শুনে উচ্ছসিত। উত্তর সেই একই। দুর্ভাগ্যের কথা।

আগস্ট মাসের এক বৃষ্টিভেজা সকালে পৌঁছে গেছিলাম মদন লালের প্রাসাদোপম বাড়িতে। অফিসের এসাইনমেন্টে আমি তখন দিল্লিতে। নয়ডার বাড়িতে বসে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন ১৯৮৩ এর বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক। লাল বলেছিলেন “চাকুদাকে সরিয়ে প্রথম দলে চান্স করে নেওয়াটা তখন আমাদের মতো জুনিয়র ক্রিকেটাররা ভাবতেও পারতাম না”। মদন সত্যিটা মেনে নিয়েছিলেন। নির্বাচকরা সেই অন্ধই হয়ে রইলেন।

কথা বলে অবাক হয়ে ভেবেছি লোকটার গ্রহণ যোগ্যতার কথা ভেবে। সোজা কথা বলা অভ্যাস। রাখ ঢাক নেই। আপস করা রক্তে নেই। কিন্তু অদ্ভুত জনপ্রিয়তা। ক্রিকেট মাঠ হোক বা রাজচন্দ্রপুরের গ্রাম। মানুষ উজাড় করে ভালোবেসেছে।

১৯৭১ সাল। বাবা সার্ভিসেস থেকে ফিরে এসেছে বাংলায়। নকশাল আন্দোলনের আগুন ঝরা দিন। আমাদের পরিবারেও সেই গনগনে আঁচ লেগেছিল বৈকি। বালি লেবেল ক্রসিংয়ের একদিকে নকশালদের দাপট। অন্যপাশে সিপিআইএম দুর্গ। একদিকের মানুষকে অন্য দিকে যেতে হয় প্রাণ হাতে করে। কিন্তু সমর তো সবার প্রিয়। পাড়ায় সমীরদা। রাজনৈতিক বৃত্তে সমীরকে বাধা যায় না। রাজনীতি দূরে সরিয়ে জঙ্গি কর্মীরা সমীর দা কে সাবধান করে গেছেন। আজ অ্যাকশন হবে। তুমি বাড়ি চলে যাও। চলো তোমায় এগিয়ে দিয়ে আসি। শেষ দিন পর্যন্ত বাবাকে এই ভালোবাসা ভুলিয়ে দিয়েছে অনেক না পাওয়ার দুঃখ।

শুধু আমাদের গ্রামই বা কেন। ময়দানেও চাকুদা চাকুদাই। বড়ো খেলোয়াড় অনেকেই হন। কিন্তু স্পষ্ট কথা বলার এমন লোক কটাই বা রয়েছে?

দুটো- তিনটে ঘটনার কথা লিখতে ইচ্ছা করছে। কোনওটা নিজের চোখে দেখা। কোনওটা ময়দানে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে শোনা।

এক বিকেলে বাবার প্র্যাক্টিস চলছে। সম্ভবত বাংলার বয়স ভিত্তিক কোনো দলের অনুশীলন। কাস্টমস মাঠ আর ইডেনের সামনে এক চিলতে জমিতে নেট পড়েছে। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছি প্র্যাক্টিস। হটাৎ বাবা চেঁচিয়ে উঠল, “এই স্বপন গুন্ডা যাচ্ছিস?”

দেখি এক ভদ্রলোক ইস্টবেঙ্গল মাঠের দিকে যাচ্ছেন। ডাক শুনে এগিয়ে এলেন। স্বপন বল। নব্বই দশকে ইস্টবেঙ্গলের স্বপন বল মানে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়। বাবা হেসে বলে উঠলো “বয়েস হচ্ছে তো। আর বেশি মাস্তানি করিস না।”

স্বপন দা হেসে উঠলেন “গুরু কেমন আছো?” অন্য কেউ হলে স্বপন দা গিলে খেতো। বুঝলাম বাবার ওপর কতটা শ্রদ্ধাশীল।

স্বপনদার গুরু ও তো এমন কথাই বলেছিলেন। পল্টু দাস। সত্তরের দশকে লাল হলুদের জীবন পল্টু জুটি ঝড় তুলে বেড়াচ্ছে। ইডেনের ক্রিকেটের বড় ম্যাচ। তুমুল গন্ডগোল। ম্যাচ ভেস্তে গেল। চুনী গোস্বামীর হাত ধরে মোহন বাগানে সই করার পর বাবা শেষ বছর ছাড়া আর ক্লাব ছাড়েনি। যাই হোক। পুরো মোহনবাগান টিম ইডেনের ড্রেসিং রুমে বন্দি। বাইরে পল্টুদাদের টিম। প্রচন্ড ঝামেলা। একটু অপেক্ষা করার পর বাবা কিট ব্যাগ নিয়ে গটগট করে হাঁটা শুরু করতেই সতীর্থদের চিৎকার “আরে চাকু বেরসনা। কি করছিস কি। পাগল হয়ে গেলি নাকি?” বাকিটুকু বাবার মুখ থেকেই শোনা যাক। ইডেনের গেটে র কাছে আসতেই দেখি ইস্টবেঙ্গলের লোকজন দাঁড়িয়ে। পল্টুদা বলে উঠলেন “চাকুকে কেউ কিছু বলবি না। বাঙালটার সাহস দেখ।” সেদিন পল্টুদার লোকেরাই বাবা কে বাসে তুলে দিয়ে গেছিলেন।

মোহন বাগান তাঁবুতে বাবাদের একটা গ্রুপ ফটো ছিল। তাঁবুতে ঢুকেই বাঁ দিকে। রিপোর্টিং এর কাজে টেন্টে গেলেই চোখে পড়তো ছবিটা।

বিকেলে মোহনবাগানে আড্ডা জমাতেন সিনিয়র মেম্বাররা। যখনই দেখা হতো অলক কাকু রা বলতেন কত পুরোনো কথা। অবাক হয়ে শুনতাম। বাবা গেলেই কোথা থেকে এসে পড়তেন ভাসিয়া মালি, গোবিন্দরাজ রা। চাকুদা কতদিন পরে এলে,,,

বাঙালি তুলনা করতে ভালোবাসে। উত্তম না সৌমিত্র? মোহনবাগান না ইস্টবেঙ্গল? হেমন্ত না মান্না? একসঙ্গে আড্ডা হলেই চায়ের কাপে তুফান উঠবেই উঠবে। আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে বরাবর। বাংলার ইতিহাসে সর্বসেরা টিম কোনটা? চুনী গোস্বামীর সেই দল না সম্বরণের এগারো? ইস। যদি একটা ম্যাচ করা যেত ইডেনে। ভাবুন তো। টস করতে চুনী আর সম্বরণ নামছেন। চুনীর টিম এইরকম। কল্যাণ চৌধুরী, গোপাল বসু, রুসি জিজিবয়, অম্বর রায়, অশোক গন্ধত্রা, নিমাই রায়, দিলীপ দশী, সুব্রত গুহ আর সমর চক্রবর্তী। সম্বরণ নামতেন আইবি রায়, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, অরুণ লাল, অশোক মালহোত্রা, রাজা ভেঙ্কট, শ্রীকান্ত কল্যাণী, সাগরময় সেন শর্মা, দত্তাত্রেয় মুখার্জিদের নিয়ে। আকাশে ঝকঝকে রোদ। রেডিও তে অজয় বসু বলে চলেছেন “নমস্কার ইডেন উদ্যান থেকে কথা বলছি অজয় বসু। ক্লাব হাউস প্রান্ত থেকে বোলিং শুরু করবেন সমর চক্রবর্তী।”

(ছবিঃ ১৯৭১-৭২ এর বাংলার রঞ্জির টিম। একদম বাঁ দাঁড়িয়ে সমর চক্রবর্তী। মাঝে মধ্যমনি চুনী। রয়েছেন অম্বর রয়, গোপাল বসু, দীলিপ দোশি, সুব্রত গুহ রা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *