ভিউ ফাইণ্ডারে আমপান পরবর্তী সুন্দরবন

জিৎ চট্টোপাধ্যায়

বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস বিশেষ প্রতিবেদন

বাবা ও দাদু ছিলেন শখের ফটোগ্রাফার। কিন্তু ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসাবে নেওয়ার জন্য একটি বহুজাতিক সংস্থায় মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরি ছেড়েছেন জিৎ। ডুব দিয়েছেন আলোকচিত্রের নেশার সমুদ্রে। আজ বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবসে থাকল জিৎ এর ছবি ও লেখা।

ঘূর্ণিঝড় আমফান পেরিয়ে গেছে তিন মাস হল। কিন্তু তার ক্ষয় ক্ষতির প্রভাব এখনও বর্তমান দুই ২৪ পরগনায়। ঘূর্ণিঝড় কালবৈশাখী বন্যা সব মিলিয়ে একেবারে নাজেহাল অবস্থায় গ্রামবাসীরা।

বিগত কয়েক বছরের একের পরে ঘূর্ণিঝড় তাদের জীবনকে করে দিয়েছে বিপর্যস্ত নেপথ্যে বিগত কয়েক বছরে গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর মাত্রা বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণ, জল দূষণ, সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি। এক কথায় বিশ্ব উষ্ণায়ন। আর তার ফলেই ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা অত্যাধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে পরিবেশের উষ্ণতাও। বারংবার ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণে জল গ্রামে ঢুকে পড়ে ক্ষতি করেছে ফসলের। লবণাক্ত হয়ে পড়েছে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের মাটি‌। বিশেষভাবে এই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সুন্দরবনবাসী। এইসব অঞ্চলের মাটি এখন চাষের অযোগ্য। যার বশবর্তী হয়ে জীবন-জীবিকায় চরম ভাটা পড়েছে সুন্দরবন এলাকার বাসিন্দাদের। বর্তমানে এইসব মানুষদের প্রধান জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাছ ধরা। কিন্তু বিভিন্ন সময় এইসব এলাকার অবস্থা জলমগ্ন থাকার ফলে সেই জীবিকা নির্বাহ সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়াও বিস্তীর্ণ অঞ্চল অবক্ষয় হয়ে চলে গেছে নদীগর্ভে। ফলতঃ অনেকেরই হারিয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁইও।

এবার আসি এই শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় তথা পশ্চিমবঙ্গের ওপর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভাবে আঘাত হানা সুপার সাইক্লোন উমপুন প্রসঙ্গে। ২০মে স্থলভাগে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় ‘আমপান’। যার প্রভাবে ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের দুই ২৪ পরগনা, হলদিয়া সহ বিভিন্ন জেলা। যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিগত শতাব্দীতে সবচেয়ে বেশি। ঝড়ের প্রকোপে প্রাণ হারিয়েছেন ১১৮ জন মানুষ। মাথার ছাদ হারিয়েছেন কয়েক হাজার মানুষের। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা সুন্দরবন অঞ্চলের। ঝড়ের দাপটে বাঁধ ভেঙে জলের তোড়ে ভেসে গেছে একাধিক ঘর। কোন বাড়ির ছাদ নেই তো কোথাও পুরো বাড়িটাই গিলে নিয়েছে নদী। জলের সাথে ভেসে গেছে শিক্ষার্থীদের বই খাতা। কিংবা ঘরে মজুদ করা খাদ্য সামগ্রী। এখনও অনেক এলাকা জলের তলায়। মানুষের পাশাপাশি প্রাণ গিয়েছে একাধিক পশুরও। আবার জলের তোড়ে ভেসে গেছে প্রচুর গৃহপালিত পশু। খাদ্য খাবার তো দূরের কথা পানীয় জল টুকু পর্যন্ত নেই সেসব জায়গায়।

বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দেওয়া খাবারই এখন ভরসা সুন্দরবন অঞ্চলের বাসিন্দাদের। কোথাও কোমর সমান জল তো কোথাওবা বুক সমান জল ঠেলে এইসব মানুষদের যেতে হচ্ছে খাবার,পানীয় জল সংগ্রহ করতে।কোথাও বা জলের গভীরতা এতটাই বেশি যে সাঁতরে পার হতে হচ্ছে ছোটদের। কোথাও আবার দেখা গেল কোমর সমান জল পেরিয়ে পোষা ছাগল কোলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছে এক ব্যক্তি। দেখা গেল বন্যা প্লাবিত চাষের জমি একা একাই পার করছে গরু। যে হয়তো কোনক্রমে প্রাণে বেঁচেছে। আধুনিকতায় মোড়া সমাজের থেকে বহুদূরে এরা। সুন্দরবনবাসীদের মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে এক চিলতে কাঁচা বাড়ি। ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় কেড়ে নিয়েছে সেটুকু নিও। স্থানীয় স্কুল বাড়িতে দিন কাটছে তাদের। ঘূর্ণিঝড়ের পরে নিজেদেরকে কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও ভরা কোটালে ফের নদীর জল ঢুকে পড়ায়, নতুন করে অসহনীয় অবস্থার শিকার হতে হয়েছে এইসব মানুষদের। আর এই সমস্ত মধ্যেই বেড়ে চলেছে আরও এক ভয়। প্রতিবছর এরকম অবস্থার সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে নারী পাচার ও শিশু পাচার চক্র। কিন্তু কতদিন? কবে বন্ধ হবে এসব? কবে হবে আবার বাঁধ মেরামতি? কবে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে এসব এলাকার জনজীবন? সেই প্রশ্ন নিয়েই এখন দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অঞ্চল অর্থাৎ সুন্দরবনের বাসিন্দারা।

নবীন ও উদ্যমী ফটোগ্রাফার জিৎ এর আরও কাজ দেখুন ওঁর ওয়েবসাইটে লিঙ্ক নীচে রইল
https://bloggsofjit.wordpress.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *